ক্লাসিকাল সরোদকে ধরে রাখার জন্য সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন

ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খান এবং তার মেয়ে রুখসানা খানসরোদ উপমহাদেশের একটি অন্যতম জনপ্রিয় ক্লাসিকাল বাদ্যযন্ত্র। বাংলাদেশে যে ক’জন অসাধারণ সরোদ শিল্পী জন্মেছেন তার মধ্যে জীবিত খ্যাতিমানদের অন্যতম হচ্ছেন উপমহাদেশের বরেণ্য সুর সাধক ওস্তাদ আয়েত আলী খার পৌত্র

সরোদের সঙ্গে কিভাবে যুক্ত হলেন?
শাহাদাত হোসেন খান : ১৯৬৩ সালের কথা, আমার পিতামহ ওস্তাদ আয়েত আলী খা আমার হাতে একটি সরোদ তুলে দেন। এরপর আমার বাবা ওস্তাদ আবেদ হোসেন খানের কাছে সরোদে আমার হাতেখড়ি হয়। বাবা এবং আমার চাচা ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খানের কাছে সরোদে তালিম গ্রহণ করি। ১৯৬৮ সালে তার সঙ্গে যুগলভাবে সরোদ বাজাই জার্মান কালচারাল সেন্টারে। ওই বছরই দ্বিতীয় বার তৎকালীন পাকিস্তান কাউন্সিল বর্তমান বাংলাদেশ পরিষদে সরোদ বাজাই। এরপরই বেতার ও টেলিভিশনে নিয়মিত সরোদ শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হই।
রুখসানা খান : ১৯৯৬ সালে আমার বাবা ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খানের কাছে সরোদে আমার হাতেখড়ি হয় এবং বাবার কাছেই সরোদে তালিম গ্রহণ করি। ১৯৯৭ সালে বোন আফসানা খানের সঙ্গে যুগলভাবে জার্মান কালচারাল সেন্টারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সরোদ বাজাই। এ বছরই বাংলাদেশ বেতারের কলকাকলি অনুষ্ঠানে শিশু সরোদ শিল্পী হিসেবে যুক্ত হই। ২০০১ সালে বাংলাদেশ বেতারে নিয়মিত সরোদ শিল্পী এবং ২০০৭ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরোদ শিল্পী সেলো পারফরমার হিসেবে তালিকাভুক্ত হই।
আপনার উল্লেখযোগ্য পুরস্কারগুলোর কথা বলুন।
ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খান : ১৯৭৪ সালে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, ১৯৮৩ সালে দ্বিতীয় নিখিল বাংলাদেশ সঙ্গীত সম্মেলনে সরোদ বাদনের জন্য স্বর্ণপদক, ১৯৯১ সালে ইনডিয়ার আইটিসি ও রাজ্য সঙ্গীত একাডেমি থেকে পুরস্কার এবং ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় পুরস্কার একুশে পদক লাভ করি।
আজকের সফলতা ও খ্যাতির পেছনে কার কার বিশেষ অবদান রয়েছে?
ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খান : আমার মায়ের অনুপ্রেরণায় যিনি এখনো আমার রেওয়াজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘুমান না এবং আমার বাবা ওস্তাদ আবেদ হোসেন খানের সর্বাত্মক সহযোগিতায় আমি আজ এ পর্যন্ত আসতে সক্ষম হয়েছি।
রুখসানা খান : আমার মা যিনি এখনো রেওয়াজ করার জন্য আমার পেছনে লেগে থাকেন এবং আমার বাবা ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খানের অবদান সবচেয়ে বেশি।
সেতার বাদন ছাড়া আর কি কি করছেন?
রুখসানা খান : আমি ভূঞা একাডেমিতে এলএলবি সম্মান প্রথম বর্ষে পড়াশোনা করছি।
আপনার উল্লেখযোগ্য সেতার অনুষ্ঠান এবং শ্রোতাদের কেমন সাড়া ছিল সে সম্পর্কে বলুন।
ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খান : ১৯৭২ সালে আমি ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খানের সঙ্গে আলাউদ্দিন সঙ্গীত সম্মেলনে যুগলভাবে সরোদ বাজাই। এ অনুষ্ঠানে উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পীরা বাজিয়েছিলেন। তাছাড়া ১৯৭৪ সালে আমার বাবা ওস্তাদ আবেদ হোসেন খানের সঙ্গে অল ইনডিয়া মিউজিক কনফারেন্স-এ যুগলভাবে সরোদ বাজাই। এসব অনুষ্ঠানে শ্রোতাদের দারুণ সাড়া ছিল।
রুখসানা খান : ২০০৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল মিউজিক ফেস্টিভালে সরোদ বাজাই। তাছাড়া ২০০৬-০৭ সালে ন্যাশনাল মিউজিক ফেস্টিভালে সরোদ বাজিয়েছি।
সরোদ শিক্ষার প্রতি কেমন আগ্রহ লক্ষ্য করছেন?
ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খান : বর্তমানে সরোদ শিক্ষার প্রতি আগ্রহী খুব একটা নেই।
সরোদ শিক্ষার প্রতি কম আগ্রহের কারণ কি?
রুখসানা খান : (ক) সরোদের অধিক দাম এবং বর্তমানকার ছাত্রছাত্রীদের স্বল্প সময়ে শেখার মানসিকতা এর অন্যতম কারণ। উল্লেখ্য, ভালোভাবে সরোদ শিখতে প্রচুর সময়, অনুশীলন, ধৈর্য, অধ্যবসায় অপরিহার্য।
সরোদের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য করণীয় কি?
ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খান : (ক) অমর চাদ সূত্রধর (ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসী) বাংলাদেশের একমাত্র কারিগর যিনি সঠিক মানসম্মতভাবে সরোদ ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র তৈরি করতে পারেন। সরকার যদি তার ভরণপোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং কিছু কারিগর গড়ে দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়; তবে বাদ্যযন্ত্র শিল্প বাংলাদেশে আবার গড়ে উঠতে পারে। এভাবে সহনীয় মূল্যে ত্রুটিমুক্ত সঠিক মানসম্মত সরোদ পাওয়া সম্ভব হবে। (খ) তাছাড়া যদি সরোদের চাহিদা বৃদ্ধি পায়, তবে বাংলাদেশে কারখানা গড়ে উঠবে। কারিগর তৈরি হবে। এভাবেও সরোদের মূল্য হ্রাস পেতে পারে।
ক্লাসিকাল সরোদ বাংলাদেশে কোন অবস্থানে রয়েছে?
রুখসানা খান : ইনডিয়ান উচ্চাঙ্গ যন্ত্রসঙ্গীত কখনোই সর্বসাধারণের প্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। এর শ্রোতা ছিল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও ক্লাসিকাল সরোদ সর্বসাধারণের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠেনি। নির্দিষ্ট একটি শ্রেণীর মধ্যে এর গ্রহণযোগ্যতা সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।
ক্লাসিকাল সরোদকে বাংলাদেশে আরো জনপ্রিয় করার জন্য কি করণীয়?
ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খান : (ক) সরকারিভাবে নিয়মিত সরোদ অনুষ্ঠান আয়োজন করতে হবে। (খ) এসব অনুষ্ঠানে প্রচুর শ্রোতার সমাগম ঘটিয়ে ক্লাসিকাল সরোদের সঙ্গে শ্রোতাদের পরিচয় ঘটাতে হবে। (গ) শিল্পীদের যথার্থ সম্মানী দিতে হবে। ফলে শিল্পীরা সরোদের প্রতি আরো বেশি একনিষ্ঠ হবে। সরোদ শেখার ব্যাপারে আগ্রহ তৈরি হবে। (ঘ) প্রাইমারি স্কুল লেভেল থেকে সরোদ শিক্ষা চালু করতে হবে। ফলে প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। (ঙ) বেতার, টেলিভিশনে বেশি বেশি সরোদ অনুষ্ঠান প্রচার করতে হবে।
ভালোভাবে সরোদ শেখা যাবে কোথায়?
রুখসানা খান : ১৯৭২ সালে ওস্তাদ আবেদ হোসেন খান ও মোবারক হোসেন খান প্রতিষ্ঠিত ওস্তাদ আয়েত আলী খান সঙ্গীত নিকেতন। যার ঠিকানা ১৩০ ওয়াপদা রোড, পশ্চিম রামপুরা, ঢাকা-১২১৯ এবং ছায়ানটে বিশুদ্ধভাবে সরোদ শিক্ষা দেয়া হয়।
দেশে ও বিদেশে অনুষ্ঠানকালে কোথায় বেশি সাড়া পান?
ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খান : বিদেশি শ্রোতারা আমাদের সরোদ বাদন যতোটা আগ্রহ নিয়ে শোনে, বাদনের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে আমাদের দেশের শ্রোতারা তা করে না।
ক্লাসিকাল সরোদ শিল্পী হিসেবে আপনি কি সন্তুষ্ট?
রুখসানা খান : শুদ্ধতার চর্চা করছি, শুদ্ধতার সঙ্গে আছি, আমার মনে হয় এটাই আমার সবচেয়ে বড় সন্তুষ্টি।
ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খান : কোনো শিল্পী কখনো পরিতৃপ্ত হয় না, অতৃপ্তিই তাকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা যোগায়।
ক্লাসিকাল সরোদ এখন বাংলাদেশে যেভাবে চলছে তার পরিণতি কি হতে পারে?
রুখসানা খান : আমরা যারা ক্লাসিকাল সরোদকে ধরে রেখেছি। সরকার যদি আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা না দেয় তবে এক সময় এ শিল্পীরা থাকবে না। শিল্পী খুজে পাওয়া যাবে না। তখন বেতার, টেলিভিশন রবীন্দ্র ও নজরুল সঙ্গীতকে ধরে রাখার জন্য ইনডিয়া থেকে শিল্পী আমদানি করতে হবে।
আপনার প্রকাশিত অ্যালবাম এবং কেমন সাড়া পেয়েছেন সে সম্পর্কে বলুন।
ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খান : ২০০০ সালে বৃটেন থেকে প্রথম সিডি ও ক্যাসেট প্রকাশ পায়। ২০০৫ সালে বৃটেন থেকে দ্বিতীয়, ২০০৬ সালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এবং ২০০৪ সালে ঢাকার সিডি প্রকাশনা সুরো মেলা থেকে একটি করে সিডি প্রকাশ পায়। এসব সিডি বৃটেনে ১৮ পাউন্ড করে বিক্রি হচ্ছে।
বাংলাদেশের সরোদ শিল্পীদের মান সম্পর্কে বলুন।
ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খান : ওস্তাদ আলাউদ্দিন খা ঘরানার শিল্পীরাই বিশ্বে সুখ্যাতি অর্জন করেছে। এই একই ঘরানার শিল্পী বাংলাদেশের সরোদ শিল্পীরা। তাই বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের সরোদ শিল্পীরা আন্তর্জাতিক মানের।
অনেকে কমার্শিয়ালি সরোদ বাজাচ্ছে, প্রচুর আয় করছে। আপনারা ক্লাসিকাল সরোদকে কেন এখনো ধরে রেখেছেন?
রুখসানা খান : আমরা অর্থের পেছনে না ছুটে আমাদের পরিবারের ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছি এবং ইনশাল্লাহ ধরে রাখবো।
বাংলাদেশে ক্লাসিকাল সরোদের প্রসারে আপনি কি আশাবাদী?
ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খান : ইওরোপের মানুষ আজ তাদের সঙ্গীতে বিরক্ত হয়ে উঠেছে। তারা আমাদের যন্ত্রসঙ্গীতের কমনীয়তায় মুগ্ধ। তাই আমি বিশ্বাস করি, একদিন বাংলাদেশের শ্রোতারা তাদের ভুল বুঝতে পারবে এবং ক্লাসিকাল যন্ত্রসঙ্গীতের প্রতি হুমড়ি খেয়ে পড়বে।

যায়যায়দিন, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০০৭

Post Your Comments

*
To prove you're a person (not a spam script), type the security text shown in the picture. Click here to regenerate some new text.
Click to hear an audio file of the anti-spam word

Bangla Music : Incoming search terms