মিউজিকের যে যন্ত্রগুলো হারিয়ে যাচ্ছে তাকে সংরক্ষণ করতে চান গাজী আবদুল হাকিম

Gazi Adbul Hakimআমাদের দেশীয় যন্ত্রসঙ্গীতকে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি দিয়েছেন যে কজন যন্ত্রশিল্পী তাদের মধ্যে অন্যতম গাজী আবদুল হাকিম। তার বাশির সুর দেশের বাইরে জাপান, আমেরিকা, ইউকে, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, ইনডিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রশংসিত হয়েছে।

বাশের বাশির সুরের জাদুতে জড়িয়ে পড়লেন কিভাবে?
ছোটবেলা থেকে খুব গান শুনতাম। বাড়ির আশপাশে হিন্দু পরিবার ছিল- তারা গান করলে বাড়ি থেকে পালিয়ে গান শুনতাম। চারু বাবু বাশি বাজাতেন। বাশি শুনে পাগল হয়ে যেতাম। মুকুল বিশ্বাস ও দুলাল বাবুর কাছে বাশি শেখা শুরু করি। ঢাকা থেকে আমাদের গ্রামে কেউ এলে তাকে বাড়িতে এনে ভাত খাওয়াতাম। রেডিওতে তার পরিচিত কেউ আছে কি না, আবদুল আলিমের সঙ্গে কথা হয় কি না জানতে চাইতাম। মূল উদ্দেশ্য, ঢাকায় তাদের সঙ্গে কাজ করা। সেটা তখন না হলেও ১৯৭৬ সালে খুলনা রেডিওতে বাশি শিল্পী হিসেবে যোগ দিই। ’৮০-এর দশকে ঢাকায় আসার পর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ক্যাসেট, মুভি, স্টেজ, টেলিভিশনে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।

কখনো ভেবেছিলেন বাশি বাজানো পেশা হবে?
কখনোই না। বাবা-মা, চেয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার হবো। আগে তো পাগল বলতো। এখন একটা অবস্থানে আসার পর হয়তো সবাই মেনে নিয়েছেন।

দেশের বাইরে কোন কোন দেশে বাশি বাজিয়েছেন?
ওয়ার্ল্ডের বহু দেশে বাশি বাজিয়েছি। যেমন- আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, লন্ডন, দুবাই, কুয়েত, কাতার, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে বহুবার গিয়েছি।

বিদেশের মাটিতে উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠানের কথা বলবেন?
গ্লাসগোতে বিখ্যাত তবলা শিল্পী জাকের হোসেনের সঙ্গে অনুষ্ঠান করার সুযোগ পাই। বৃটিশ পার্লামেন্ট লন্ডন হাউস অফ কমন্সে এক অনুষ্ঠানে সলো বাশি বাজিয়েছি। তাছাড়া ফ্রান্স ও জাপানে বাশির সলো প্রোগ্রাম করেছি। পাকিস্তানের এক প্রোগ্রামে স্পিকার এবং মন্ত্রী অনুষ্ঠান শেষে খুজে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। রাজা সৈয়দ মোজাফর আলী ও বেলায়েত আলী খানের মেয়ে জিল্লা খাকে নিয়ে থিম মিউজিক করেছি। সেখানে আমার বাশি আছে। হলিউডের মুভিতে আমার বাশি ব্যবহার হচ্ছে।

আপনার বাশির ক’টি অ্যালবাম বাজারে রয়েছে।
ঘরে ফেরা, মাই লাভ, অনুরাগসহ ১৫টির বেশি অ্যালবাম বাজারে রয়েছে।

নতুন কোনো অ্যালবাম কি ভক্তরা খুব শিগগির পাবে?
আমাদের দেশকে নিয়ে ক্লাসিকাল ও ফিউশনের ওপর মাদার ল্যান্ড নামে একটি অ্যালবামের কাজ চলছে। খুব শিগগির সেটি শ্রোতারা বাজারে পাবে।

আপনার দীর্ঘ কর্ম জীবনে কোন বিষয়টি বেশি কষ্ট দেয়?
সব মন্ত্রণালয়ের চাকরিজীবী পেনশন পান। শুধু যন্ত্রশিল্পীরা অর্থাভাবে মারা যাবে, তাদের কোনো পেনশন নেই- এটা ভাবতে খুব খারাপ লাগে।

সবচেয়ে সুখের স্মৃতির কথা বলবেন?
১৯৭১ সালে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পেরে খুব ভালো লেগেছে। এছাড়া ইংল্যান্ডের হাউস অফ কমন্সে বাশি বাজানোর স্মৃতি কখনো ভুলবো না।

এ পর্যন্ত কতোটি স্টেজ প্রোগ্রাম করেছেন?
দেশ-বিদেশে মিলিয়ে অসংখ্য প্রোগ্রাম করেছি। এটা হিসাব করে বলা কঠিন।

একোস্টিক যন্ত্র আমাদের দেশের ঐতিহ্য। ইলেকট্রনিকস যন্ত্রের কারণে এটা এখন হারিয়ে যাচ্ছে। সংরক্ষণের উপায় কি?
বন্য প্রাণীকে সরকার যেভাবে সংরক্ষণ করছে যেমন- তাদের মারতে দিচ্ছে না, পাহারা দিয়ে রাখা হচ্ছে তেমনি করতে হবে।

যন্ত্রশিল্পীদের পরিবারের প্রতি আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন বলে মনে হয়?
আমার মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে দেখেছি অনেক ছেলে পক্ষ আমি বাশি বাজানোয় না করে দিয়েছে। আমার মেয়ে বিয়ে দিতে খুব কষ্ট হয়েছে। এটা ভাবলে খুব দুঃখ লাগে।

আগামীর ভাবনা কি?
আমি চাই বিনা পয়সায় বাশি বাজানো শেখাতে। ইতিমধ্যে ঢাকায় আমার অনেক স্টুডেন্ট হয়েছে, যাদের বিনা পয়সায় শেখাচ্ছি। এছাড়া আমাদের দেশে যে একস্টিক যন্ত্রগুলো আছে তা দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে। এগুলো সংরক্ষণ করতে চাই। আমার আয় দিয়ে মায়ের নামে একটি হসপিটাল করবো। সেখানে বিনা পয়সায় চিকিৎসা করাবো। বিনা চিকিৎসায় যেন কোনো মা না মরে।

সূত্রঃ দৈনিক যায়যায়দিন।

Post Your Comments

*
To prove you're a person (not a spam script), type the security text shown in the picture. Click here to regenerate some new text.
Click to hear an audio file of the anti-spam word

Bangla Music : Incoming search terms