শেফালী ঘোষ আর গাইবেন না

এক বিশাল জনপদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনাকে তিনি তার কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন। তার গানে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের জীবনাচরণ আর সংস্কৃতি। আর তিনি তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বঙ্গের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। প্রাণের সুরে মানুষের মনের কথাটি ছড়িয়ে দিতে দিতে যিনি জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন সেই শেফালী ঘোষ (৬৫) তার সুরের ভুবন ছেড়ে চলে গেলেন।

দীর্ঘদিন ধরে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত রোগে ভোগার পর তিনি গত রোববার (৩১ ডিসেম্বর ২০০৬) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্বামী ননী গোপাল দত্ত ও ছেলে সুদীপ্ত দত্ত ছোটনকে রেখে গেছেন। তিনি ছিলেন বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের কন্ঠস্বর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম শিল্পী।

শেফালী ঘোষের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া গত ২ জানুয়ারি সোমবার পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার গ্রামের বাড়ি বোয়ালখালীর কানুনগো পাড়ায় সম্পন্ন হয়। বিকাল তিনটায় পারিবারিক শ্মশান ঘাটে তাকে দাহ করা হয়। এ সময় তার পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক কর্মী এবং তার অসংখ্য ভক্ত উপস্থিত ছিলেন। এর আগে শিল্পীর মরদেহ কানুনগো পাড়ায় নিয়ে যাওয়া হলে তার অংসখ্য মানুষ শেষবারের মতো তাদের গানের রানীকে এক নজর দেখার জন্য ভিড় করে। বিশিষ্ট সুরকার ও গীতিকার ননী গোপাল দত্ত জানান, শনিবার বেলা তিনটায় শেফালী ঘোষকে নগরীর সেন্টার পয়েন্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে রাত নয়টায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলের সিসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

চলতি বছরের ৯ এপ্রিল মস্তিস্কে রক্তক্ষরণের কারণে লোকগানের সম্রাজ্ঞী নন্দনকাননের নিজের বাসায় অজ্ঞান হয়ে পড়েন। মস্তিস্কে রক্তক্ষরণের ফলে অবশ হয়ে পড়ে তার শরীরের ডানপাশ। স্থানীয় কয়েকটি হাসপাতালে চিকিত্সার পর মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে গত ১৪ এপ্রিল নেওয়া হয় কলকাতার এ্যাপোলো হাসপাতালে। সেখানে প্রায় আড়াই মাস চিকিৎসার পর খানিকটা সুস্থ হলে ৪ জুলাই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। চট্টগ্রামে ফেরার পর তিনি হুইল চেয়ারে চলাফেরা করতেন। সে সময় শিল্পীর চিকিত্সায় সহায়তার জন্য ভোরের কাগজ ‘শেফালী ঘোষ চিকিত্সা সাহায্য তহবিল’ গঠন করে অর্থ সংগ্রহ করে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম শিল্পী কল্যাণ সংস্থার আমৃত্যু সভাপতি শেফালী ঘোষের জন্য চট্টগ্রামে একটি কনসার্টের আয়োজন করা হয়। সব মিলে আয় হয়েছিল প্রায় ২০ লাখ টাকা, যা দিয়ে তার চিকিত্সার ব্যয় মেটানো হয়।

আঞ্চলিক গানসহ মাইজভাণ্ডারী, লোকসঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ওপর শেফালী ঘোষের দেড়শ’র বেশি অডিও ক্যাসেট ও বেশ কয়েকটি ভিসিডি বের হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশসহ বিশ্বের ২৪টি দেশের কনসার্টে অংশ নেন তিনি। শেফালী ঘোষ বিভিন্ন সংগঠনের অসংখ্য পুরস্কার আর কোটি মানুষের হৃদয়ের পুরষ্কারে ভূষিত হলেও তার ভাগ্যে কোনো জাতীয় পুরস্কার জোটেনি। চাটগাঁর আঞ্চলিক গানের সম্রাজ্ঞীর জনপ্রিয় গানের তালিকায় রয়েছে- ‘যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম’, ‘নাতিন বড়ই খা বড়ই খা’, ‘সূর্য ওডের ও ভাই লালমারি’, ‘আশকার দীঘির পশ্চিম পাড়ত আঁর ভাঙ্গা ঘর’ ইত্যাদি।

লোক গানের আর এক মহান শিল্পী শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব এবং শেফালী ঘোষের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের বিখ্যাত জুটি। দীর্ঘ চার দশক জুড়ে তারা দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্তের মন জয় করেন। তাদের গাওয়া ‘বানুরে ও বানু’, ‘আঁর বউরে আঁই কান্দাইউম’, ‘ও শ্যাম রেঙ্গুন ন যাইও’ সহ বেশ কিছু গান গভীরভাবে দাগ কেটেছে শ্রোতাদের মনে। ২০০০ সালে শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণবের মৃত্যুর পর জুটি ভাঙার বেদনায় মুষড়ে পড়েন শেফালী ঘোষ। গানের জগতে তার পদচারণা অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়ে। শ্যাম সুন্দরের পর শেফালী ঘোষের মৃত্যুর ফলে প্রায় শূন্যই হয়ে পড়লো চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের ভুবন। শেষকৃত্যানুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়ার আগে শিল্পীর মরদেহ নন্দনকাননস্থ বাবা লোকনাথের মন্দিরে রাখা হয়েছিল। তার মৃত্যুর খবর পেয়ে রাতে সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তাকে শেষবারের মতো দেখতে যান।

শেফালী ঘোষ ১৯৪১ সালে বোয়ালখালীর কানুনগো পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। স্বামী ননী গোপাল জানান, ২০ বছর বয়সে গান শিখতে চট্টগ্রামে আসেন শেফালী। আর গান শেখার সূত্র ধরেই তাদের দুজনের পরিচয়, শেষ পর্যন্ত যা পরিণয়ে রূপ নেয়। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে শেফালী ঘোষ এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, ‘বুকের মধ্যে খারাপ লাগছে।’ কণ্ঠ দিয়ে কথা বেরুচ্ছিল না। তারপরও তিনি গান গাওয়ার আশা ছাড়েননি। প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আমি ভালো হবো তো, আবার গান গাইতে পারবো তো?’ শেফালী ঘোষের উদ্যম দেখে কিছুতেই তখন মনে হয়নি এতো তাড়াতাড়ি তার কণ্ঠ চিরদিনের জন্য সত্মব্ধ হয়ে যাবে! শেফালী ঘোষ আর গাইবেন না সত্যি, কিন্তু তিনি যা গেয়েছেন তা চিরদিন এই বাংলার মাটি, জল আর আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হবে চিরদিন।

উত্সঃ ইএনএস

Bangla Music Tags: , , , , , ,

Related posts

One Response to “শেফালী ঘোষ আর গাইবেন না”

  1. Evergreen Bangla | January 8th, 2007

    বাংলাদেশের সংগীতাকাশ থেকে ঝরে পড়লো আর একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। এ জায়গা কী ক্কখনো পূরণ হবার! সময় মত চেষ্টা করলে হয়তো তিনি আরো দিন বেঁচে যেতে পারতেন।

Post Your Comments

*
To prove you're a person (not a spam script), type the security text shown in the picture. Click here to regenerate some new text.
Click to hear an audio file of the anti-spam word

Bangla Music : Incoming search terms