বাংলা গানের ঐতিহ্য অতীত থেকে বর্তমান
সঙ্গীত বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বাংলা গানের ব্যুৎপত্তি সেভাবে খুজে বের করা কঠিন। প্রাচীনতম বাংলা গান বলতে কি বোঝায়?
অনেকের মতে চর্যাপদ, বৈষ্ণব ও শাক্ত পদাবলী ইত্যাদি- যার পদগুলোতে সুর দিয়ে গাওয়া হয়েছে কয়েক প্রজন্ম ধরে। পরে রামপ্রসাদ সেন, মুকুন্দরাম দাস, জয়দেব, কৃত্তিবাস ওঝা এদের লেখা যুগ যুগ ধরে গান হয়ে ঘুরে ফিরেছে মানুষের মুখে মুখে। সুতরাং বলা যেতে পারে বাংলা গানের শুরু লোকগান দিয়ে। লোকগান বলতে যেসব গান সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এসেছে। তবে ছিল বিশেষ বিশেষ সম্প্রদায়ের গান-যেমন, মাঝিদের ভাটিয়ালি গান, উত্তর বঙ্গের এক বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ গাইতেন ভাওয়াইয়া গান, পূর্ববঙ্গের সত্যপীর বা বীরভূমের রাঢ় বাংলার বাউল গান বা চাষীদের নবান্নের গান। এছাড়া ছিল পালাগান, যাত্রাগান, তরজা, আখড়াই ইত্যাদি। ভক্তিমূলক কীর্তন এখনো জনপ্রিয়।
ইংরেজদের রাজত্বকালে শুরু হয় শহরে গান। শহর কলকাতার বাঙালি বাবুদের গানের আসর থেকে শুরু হয় টপ্পা, ঠুংরি জাতীয় গান, যে গানগুলো মূলত হিন্দুস্তানি রাগের ওপর ভিত্তি করে বাংলা ভাষায় গাওয়া ধ্রুপদী গান। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে এবং বিংশ শতাব্দীতে বাংলা গানে অভাবনীয় পরিবর্তন আসে। রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মসমাজের উপাসনা সঙ্গীত ছিল ব্রহ্মসঙ্গীত। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ বহু ব্রহ্মসঙ্গীত রচনা করেন।
এরপর আসেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার লেখা ও সুরারোপিত গান যা পরে রবীন্দ্র সঙ্গীত নামে পরিচিত হয়, বাংলা গানে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। রবীন্দ্র সঙ্গীতে ভাব ও সুরের অসাধারণ সমন্বয় বাংলা ভাষাভাষীদের মোহিত করে। রবীন্দ্রনাথ ইনডিয়ান সনাতনী ও ধ্রুপদী রাগ নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। বহু নতুন সুর রচনা করেছেন। প্রায় ২ হাজার ৫০০ গান রচনা করেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র সঙ্গীত বাংলা গানের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে ওঠে।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন-তাদের গানও একটা স্বাতন্ত্র্য তৈরি করে বাংলা গানে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কাজী নজরুল ইসলামের গান (নজরুল গীতি) তৈরি করে অন্য একটি ধারা। রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে বাংলা গান, প্রাক স্বাধীনতা যুগে বলা হতো দেশাত্মবোধক গান এবং স্বাধীনতার পরে গণসঙ্গীত। বিংশ শতাব্দীতে রেডিওর আবির্ভাব গান শোনার জগতে অন্য মাত্রা আনে, শ্রোতাদের পরিধি দ্রুত প্রসার পেতে থাকে। বাংলা রেডিও ও চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে রবীন্দ্র উত্তর আধুনিক বাংলা গান। এ সময় অনেক প্রতিভাবান গায়ক, লেখক, সুরকারের আবির্ভাব হয় বাংলা গানে। শচীনদেব বর্মণের লোকগীতি ভিত্তিক সুর জনপ্রিয়তা লাভ করে। পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে সলিল চৌধুরীর সুর মাতিয়ে তোলে সঙ্গীতপ্রেমী বাঙালির হৃদয়। পঞ্চাশ থেকে সত্তর দশকের বাংলা চলচ্চিত্র ও আধুনিক গান ভীষণভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
নব্বইয়ের দশকে একঝাক বাঙালি গায়ক বাংলা গানে আনলেন নতুন স্টাইল নাগরিক লোকগান যা জনগণের কাছে জীবনমুখী গান নামে বেশি পরিচিতি পায়। ষাটের দশকের পশ্চিম দেশের কিছু লোকগানের আদলে গাওয়া বাংলা গান। পরেই আসে বাংলা ব্যান্ড ষাট-সত্তরের দশকের পশ্চিমি রক ব্যান্ডের আদলে গাওয়া বাংলা গান। বিদেশি গানের ছায়ায় তৈরি হলেও বাঙালি শ্রোতাদের কাছে নতুন, বিশেষ করে যুব সম্প্রদায় এ নতুন ধরনের গানের অনুরাগী হয়ে ওঠেন।
নিত্য নতুন প্রযুক্তি গানকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে থাকে। রেকর্ড প্লেয়ার, ক্যাসেট প্লেয়ার থেকে অত্যাধুনিক ডিজিটাল মাধ্যম, বেতার, দূরদর্শন-গানকে করেছে আরো সহজলভ্য। সঙ্গে বিবর্তন হয়েছে বাদ্যযন্ত্রের-বাশি, একতারা, সেতার, ঢোল, মাদল, তানপুরা, হারমোনিয়াম, তবলা, পিয়ানো থেকে এসেছে ইলেকট্রিক গিটার, ড্রাম, কি-বোর্ড, কমপিউটার। বাংলা গানের বিবর্তন এখনো চলছে।
সূত্রঃ দৈনিক যায়যায়দিন, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০০৭


Post Your Comments