ফেলে আসা জীবনে চিরসবুজ মুহূর্তে যে ভালোবাসায় অকারণ কেঁপেছে হৃদয়, সেই প্রিয়ক্ষণ যেন বারংবার মনের আঙ্গিনায় হানা দেয়। বলে যায় কেউ একজন ভালোবাসতো তোমায়। প্রেম, অভিমান আর অশ্রু আজন্ম যেন যাপিতজীবনে এঁকে গেছে প্রিয় মানুষের ছবি। হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার গানে নবরূপে ফেরদৌস আরা বলেছেন ছলনায় যেমন ভুলবো না তেমনি ভালোবাসার মোহে তোমারে লেগেছে আমার এত যে ভাল। সম্প্রতি ইমপ্রেস অডিও ভিশন-এর ব্যানারে প্রকাশিত হয়েছে বরেণ্য এই শিল্পীর দুটি অ্যালবাম। ভালোবাসার গানের অ্যালবামগুলো নিয়ে লিখেছেন রুদ্র মাহ্ফুজ
বিকেল ফুরিয়ে এলো তবুও যেন ভালোবাসায় সিক্ত হওয়া ফুরালো না ফেরদৌস আরা’র। বাংলা গান বিশেষ করে নজরুলগীতিতে অনন্য এই শিল্পীর পঞ্চাশতম জন্মদিন বেশ ঘটা করেই পালন করা হল মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর মিলনায়তনে। জন্মদিনের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিতে ইমপ্রেস অডিও ভিশন আনন্দের এই শুভলগ্নে প্রকাশ করেছে তার বাংলা গানের অ্যালবাম ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভাল’। এছাড়া নতুন এই গানের অ্যালবামের পাশাপাশি প্রকাশ করেছে তার অংশগ্রহণে চিত্রায়িত গানের ভিডিও অ্যালবাম ‘আমি তার ছলনায় ভুলবো না’। রাশি রাশি ফুল আর বিশাল পর্দায় ফেরদৌস আরা’র সংগীতের ভিডিও প্রদর্শন যেন অনুষ্ঠানটিকে করেছিল অনেক বেশি প্রাণবন্ত। স্নিগ্ধ বিকেলের এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন সুধীন দাশ, মোস্তফা জামান আব্বাসী, আবদুশ শাকুর, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও আসাদ চৌধুরী। দিনটিকে স্মরণীয় করতে ফেরদৌস আরা’র হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন সুধীন দাশ আর মোস্তফা জামান আব্বাসী পরিবেশন করেন ফেরদৌস আরা’র একটি গানের অংশবিশেষ। সংগীত জগতের কিংবদন্তীদের এই মিলনমেলায় বক্তব্য রাখেন আসমা আব্বাসী, সাদাত সেলিম এবং বুলবুল মহালনবীশ। কিছুদিন পূর্বে অবশ্য ফেরদৌস আরা সংগীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন তার ‘নূপুরের ছন্দ’ অ্যালবামের মাধ্যমে। শৈশব থেকে এখন অবদি সবকিছুই স্বপ্রণোদিত হয়ে পারিবারিক আবহে থেকেই করেছেন ফেরদৌস আরা। গান, কৈশোরে নাচ কিংবা কলেজে পড়াকালীন খেলাধূলা সবকিছুতেই তিনি ছিলেন অনন্যা। কৈশোর আর তারুণ্যের সেই বিশ্বাস আর সৃষ্টি বরাবরই পুষ্টি যুগিয়েছে ফেরদৌস আরা’কে আগামী দিনের সাহসী পথ চলায়। এক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সংগীত শুধু কক্তের বা সুরের সাধনা নয়। সংগীত অন্যকিছু। রেওয়াজের পর রেওয়াজ করে সংগীত শুধু সংগীত হতে পারে কিন্তু শ্রুতিমধুর হয় না। আর সেজন্য প্রয়োজন মেধা। যার যত মননশীলতা রয়েছে, সে তত শ্রুতিমধুর সংগীত উপহার দিতে পারে।’ এবারের অ্যালবামগুলোতে ফেরদৌস আরা’র কণ্ঠে যে গানগুলো রয়েছে সেগুলো হল- তোমারে লেগেছে এত যে ভাল, আমি তার ছলনায় ভুলবো না, মধু মালতি ডাকে আয়, বলছি তোমার কানে কানে, তুমি সুন্দর হে এসো না, নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে, আমার হাড় কালা করলাম রে, জানি না সে হৃদয় কখন এসেছে, আর ডেকো না সেই মধু নামে, ওরে মন পাখি, যেতে দাও আমায় ডেকো না এবং নিশীথে যাইও ফুল বনে। হারানো দিনের ভালোবাসার এই গানকে নতুন রূপে উপস্থাপন করা প্রসঙ্গে ফেরদৌস আরা বলেন, ‘বাঙলা গানের সোনালী অতীতে যে গানগুলো হয়েছে তা যেন শুধু গান নয় এক একটি অধ্যায়। এই গানগুলো এতই শ্রুতিমধুর যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে তার আকুলতা শেষ হবার নয়। গানের কথা, সুর ও সংগীতে যে নান্দনিকতার মিশেল রয়েছে তা এক অর্থে অসাধারণ। জীবনের প্রতিক্ষণে মানুষ এই গানগুলোকে অনুভব করে, ভালোবাসে বলেই হয়ত সময়ের পিঠে চড়ে এই গানগুলো অনেক বারই রূপের ভিন্নতায় এসেছে শ্রোতাদের আঙ্গিনায়। আমি চেষ্টা করেছি গানের মৌলিকতাকে অক্ষুন্ন রেখে শ্রুতিমধুর এই গানগুলোকে আরও নান্দনিক করতে।’ তোমারে লেগেছে এত যে ভাল শীর্ষক অ্যালবামে সংগীত পরিচালনা করেছেন রিচার্ড কিশোর। অন্য এক প্রসঙ্গে ফেরদৌস আরা বলেন, ‘আমার গায়কীর পিছনে বরাবরই ছিল অনুকরণ নয় স্বকীয়তাকে অটুট রাখতে হবে। এটা গান শেখার শুরুতে যেমন ছিল এখনো তেমনি আছে। স্বকীয়তাহীন গান কখনো শ্রোতার দুয়ার পর্যন্ত যায় না। তার আগেই হারিয়ে যায়। আমি এই অ্যালবামে হারানো দিনের গানগুলোর মৌলিকতা অক্ষুন্ন রেখেই কাজ করতে চেয়েছি। তারপরও দীর্ঘদিনের ফ্রেমে থাকা গানগুলোর মাঝে ভিন্নতার প্রয়াস তো আছেই। একজন শিল্পী গানে তার ছোট ছোট কাজ দিয়েই নিজেকে ব্যতিক্রম হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।’ সারাবেলা গানই যেন জড়িয়ে থাকে ফেরদৌস আরা’কে। তবে এর মাঝে নিজের সংগীত প্রতিষ্ঠান ‘সুরসপ্তক’ নিয়েও কাজ করেন বিস্তর। নিজেকে এখনো শিক্ষানবীশ মনে করে ফেরদৌস আরা বিনয়ের সাথেই সংগীতকে আলিঙ্গন করতে চান জীবনের শেষ অবদি। অর্ধশতক নয় ফেরদৌস আরা সংগীতের মাঝে বেঁচে থাকুক যুগ-যুগান্তর সেই প্রত্যাশা আর প্রার্থনাই করেছেন যেন অ্যালবামে মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আসা শত শত সংগীত অনুরাগী।
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, অক্টোবর ১৫, ২০০৯
Tags: আসাদ চৌধুরী, কিশোর, নজরুলগীতি, ফেরদৌস আরা, মোস্তফা জামান আব্বাসী
Related News:
Leave a Reply