স্পর্শেই ভাংচুর স্পর্শেই রোদ্দুর

Ayub Bachchu - Bangla Musicসারাদিনের ভ্যাপসা গরমের পর সন্ধ্যার দিকে আকাশের বুকে বেজে উঠল মেঘ-বালিকার রিমঝিম নূপুর। শুরু হলো বর্ষার প্রথম বৃষ্টি। কর্মব্যস্ত দিন শেষে বাড়িফেরা মানুষগুলোর ছুটোছুটি, দৌড়ে গাড়িতে ওঠার চেষ্টা, আশপাশের মার্কেটগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে কেউ কেউ। মুহূর্তে ফাঁকা হয়ে গেল পুরো রাজপথ। আমি তখনো রাস্তায়। রিকশার হুড ফেলে দিয়ে ঝিরঝিরে হিমেল হাওয়ায় ভিজতে ভিজতে গুনগুন করছি এলআরবির সর্বশেষ অ্যালবাম স্পর্শের টাইটেল সং- স্পর্শেই ভাংচুর, স্পর্শেই রোদ্দুর/স্পর্শেই তোলপাড়, স্পর্শেই চুরমার/স্পর্শেই নীল মেঘ, স্পর্শেই উদ্বেগ/স্পর্শেই বিস্ময়, স্পর্শেই নির্ভয়…। বর্ষার এ জল স্পর্শ সারা শরীরে বইয়ে দিচ্ছে অদ্ভুত এক ভালো লাগা। রিকশাটাকে মনে হচ্ছে মেঘবাহন। যেন মেঘের মতোই উড়ে উড়ে পৌঁছে যাচ্ছি গন্তব্যে।

গন্তব্য- মগবাজারের কাজী অফিস গলি, এলআরবির কর্ণধার আইয়ুব বাচ্চুর এ বি কিচেন। আমার সিডিউল ছিল বিকাল ৫টা, আর এখন বাজে রাত প্রায় ৮টা। স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিয়েছিলাম আইয়ুব বাচ্চু হয়তো ক্ষেপে যাবেন, হয়তো আর সাক্ষাৎকার দিতে চাইবেন না। শিল্পীরা, বিশেষত যারা কম্পোজার, সাধারণ মানুষের চেয়ে তাদের সময় অনেক বেশি মূল্যবান। প্রতিটা ঘণ্টা-মিনিট হিসাব করে চলতে হয় তাদের। তাই কোনো সিডিউল মিস হলেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু আইয়ুব বাচ্চু মেজাজ খারাপ করলেন না, শুধু বললেন, এমন সময় এসছো, যখন আমি বের হচ্ছি। সরি- বলে দেরি করার কারণটা ব্যাখ্যা করতে চাইলাম। সে সুযোগ দিলেন না তিনি। বললেন, কী নিয়ে কথা বলবে, ঝটপট বলে ফেলো।

শুরুটা করলাম স্পর্শ দিয়েই। স্পর্শের পর এলআরবির বর্তমান কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলাম। আইয়ুব বাচ্চু বললেন, এলআরবির বর্তমান কার্যক্রম স্টেজ শো নিয়ে। প্রায়ই দেশের কোথাও না কোথাও এলআরবির শো থাকছে। স্টেজে আমরা পুরনো গানের পাশাপাশি শ্রোতাদের অনুরোধে নতুন অ্যালবামের গানও করছি। বেশির ভাগ অনুরোধই আসছে টাইটেল আর সাবিত্রী রায় নিয়ে। গান দুটি এখন অনেকেরই প্রিয় হয়ে উঠেছে। টাইটেল গানটির সুর গ্রাম-বাংলার পুঁথি গানের চলনে। কম্পোজিশন প্যাটার্ন গৌটিক রক। গানটির বিশেষ দিক হচ্ছে এর ড্রামিং, সেই সঙ্গে পাওয়ারফুল গিটার রিপ। স্টেজের জন্য পারফেক্ট সং। সাবিত্রী রায় গল্পনির্ভর গান। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে ফেলা এক কিশোরের অবুঝ প্রেম নিয়ে সাজ্জাদ হোসাইনের লেখা অসাধারণ এ গানটির মাধ্যমে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনা আর স্মৃতি-বিস্মৃতি। আর এ কারণেই এলআরবির ভক্তরা সাবিত্রী রায় গানটা বেশি পছন্দ করছে।

প্রসঙ্গক্রমে জানতে চাইলাম, সাবিত্রী রায় নিয়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার কী হলো? আইয়ুব বাচ্চু বলেন, কাজটা মাঝপথে থেমে আছে। ফারুকী ব্যস্ত হয়ে পড়লো তার অন্যান্য কাজ নিয়ে, আমি ব্যস্ত স্টেজ আর নিজের একক অ্যালবাম নিয়ে। ফলে কাজটা ঠিকমতো হয়ে উঠছে না। তবে শিগগিরই আবার শুরু হবে বলে জানান তিনি।

একক অ্যালবাম! কবে শুরু হলো, কী ধরনের গান হচ্ছে, কতো দূর এগিয়েছে কাজ, শ্রোতারা কবে অ্যালবামটি হাতে পাবে? একসঙ্গে এতো প্রশ্ন! শুরু করেছি স্পর্শের বেশ কিছুদিন পর। কী ধরনের গান করছি এটা এখনই বলতে চাই না। থাক না কিছুটা চমক! তবে এটুকু বলতে পারি, একেবারেই ভিন্ন আঙ্গিকের কিছু গান নিয়ে আসছি এবার একক অ্যালবামে। কাজ প্রায় অর্ধেক শেষ। সবকিছু ঠিক থাকলে আশা করি আগামী ঈদে শ্রোতারা অ্যালবামটি হাতে পাবে। তবে অ্যালবামটি কোন ব্যানার থেকে মুক্তি পাবে, এটা এখনো ঠিক করা হয়নি বলে জানান আইয়ুব বাচ্চু।

প্রায় দুই বছর আগে সঙ্গীতার ব্যানারে মুক্তি পায় আইয়ুব বাচ্চুর সর্বশেষ একক অ্যালবাম জীবন। সে সময় দেশের রাজনৈতিক টানাপড়েন, সারাদেশের সামগ্রিক অস্থিরতা, মানুষের অর্থনৈতিক দৈন্যদশা আর সীমাহীন অডিও পাইরেসির কবলে পড়ে অ্যালবামটি আশানুরূপ সফলতা পায়নি। তবে নানা কারণে অ্যালবামটি বেশ আলোচিত ছিল। অ্যালবামটি মুক্তি পাওয়ার আগে আইয়ুব বাচ্চুর মা ইহলোক ত্যাগ করেছিলেন। আর এ অ্যালবামটি বাচ্চু তার প্রয়াত মাকে উৎসর্গ করেছিলেন। এ অ্যালবামের মা গানটি তখন অনেক মা-হারা শ্রোতার হৃদয় স্পর্শ করেছিল। অনেকেরই মুখে মুখে ফিরছিল তখন- ‘ওই দূর আকাশের তারারে, বলে দেনা কোনটা আমার মা।’

এ তো গেল একক অ্যালবামের কথা। কিন্তু ইয়াং ক্রেজ অর্ণবের সঙ্গে একটি দ্বৈত অ্যালবাম হওয়ার কথা, তার কী হলো? উত্তরে তিনি বলেন, সেটা অর্ণবই ভালো বলতে পারবে। এ অ্যালবামটির পরিকল্পনাই করেছিল অর্ণব। স্পর্শ নিয়ে বেঙ্গল মিউজিকের সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক, অর্ণবের সঙ্গে যে ঘনিষ্ঠতা তার সূত্র ধরেই অর্ণব আমাকে প্রস্তাবটি দেয়। আমি এক কথাতেই রাজি হয়ে যাই। কারণ, একজন সিঙ্গার ও একজন কম্পোজার হিসেবে অর্ণবকে আমার বেশ পছন্দ। এখন অ্যালবামটির ব্যাপারে অর্ণবকেই এগিয়ে আসতে হবে। অর্ণবের দিক থেকে সাড়া পেলেই আমি পুরো প্রস্তুতি নেবো, তার আগে নয়।

অর্ণবের পর সা টু সা’র প্রসঙ্গ তুলতেই বেশ তৃপ্তির হাসি হাসলেন আইয়ুব বাচ্চু। বলেন, আমি কখনোই ভাবতে পারিনি বাংলাদেশের শ্রোতারা একজন কণ্ঠশিল্পীকে যেমন ভালোবাসে, তেমনি ভালোবাসে একজন যন্ত্রশিল্পীকেও। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কণ্ঠশিল্পীর চেয়ে যন্ত্রশিল্পীকেই ভালোবাসে বেশি। আমি রীতিমতো মুগ্ধ ও বিস্মিত হয়েছি এ প্রোগ্রামটির দর্শকপ্রিয়তা দেখে। আমাদের মিডিয়ায়, বিশেষ করে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় যন্ত্রশিল্পীরা খানিকটা উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। তাই যন্ত্রশিল্পীদের নিয়ে সিটিসেল মোবাইল কোম্পানি ও চ্যানেল আইয়ের হাসান আবিদুর রেজা জুয়েলের এ রকম একটা পরিকল্পনার কথা শুনে আমার খুবই ভালো লাগে। এ প্রোগ্রামটি পুরোপুরি যন্ত্রশিল্পীদের নিয়ে। একটা বাদ্যযন্ত্র নিয়ে আলোচনা আর সেই সঙ্গে একজন যন্ত্রশিল্পীর আদ্যোপান্ত নিয়ে সাজানো হয় প্রতিটি পর্ব। এ পর্যন্ত অতিথি হিসেবে সা টু সাতে আমন্ত্রিত হয়েছেন সুনীল চন্দ্র দাস, গাজী আবদুল হাকিম, দশরথ দাস, ইউসুফ খান, রিনাত ফৌজিয়া, একরাম হোসেন, মনির হোসেন, দেবব্রত চৌধুরীসহ অনেকে। সা টু সা শুরু হয়েছিল চলতি বছরের জানুয়ারিতে। এ পর্যন্ত এর ১৬টি পর্ব প্রচারিত হয়েছে। আজ দেখা যাবে এর ১৭তম পর্ব। এ পর্বে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছেন বিখ্যাত তবলাবাদক মিলন ভট্রাচার্য। তবে আগামী পর্বগুলোতে সা টু সা কিছুটা পরিবর্তিত হচ্ছে। বিখ্যাত যন্ত্রশিল্পীদের পাশাপাশি দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা যন্ত্রশিল্পীদের তুলে আনা হবে পরবর্তী পর্বগুলোতে। প্রাথমিক কাজ হিসেবে আমরা সারাদেশকে ছয়টি জোনে ভাগ করে নিয়েছি। আগামী পর্বগুলোর জন্য আমি ও আমার টিম ঢাকার বাইরে যাবো। এক এক করে সব জোন থেকেই আমরা যন্ত্রশিল্পীদের তুলে আনবো এ প্রোগ্রামটির মাধ্যমে।

সা টু সার আগে আরটিভিতে আর মিউজিক নামে অন্য একটি প্রোগ্রাম করতেন। সেটা বন্ধ হলো কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে আইয়ুব বাচ্চু বলেন, তুমুল জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতার কারণে প্রোগ্রামটি বন্ধ হয়ে যায়। আর মিউজিকের শেষ কয়েকটি পর্ব এ পর্যন্ত পাঁচ-ছয়বার করে পুনঃপ্রচার করা হয়েছে। এতেই বোঝা যাচ্ছে প্রোগ্রামটি কতোটা দর্শকপ্রিয় ছিল। অথচ দুঃখের বিষয়, এ প্রোগ্রামের পারিশ্রমিক আমি ঠিকমতো পাইনি। শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার শ্রমের মূল্য পরিশোধ করার নিয়ম থাকলেও আরটিভি কর্তৃপক্ষ তা মেনে চলেননি। আশা করি, আরটিভি কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে সদয় মনোযোগ দেবেন।

সবশেষে জানতে চাইলাম বর্তমানে কী করছেন? আইয়ুব বাচ্চু জানান, বর্তমানে একটি চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন তিনি। এ ছবিতে আইয়ুব বাচ্চুর সুর ও সঙ্গীত পরিচালনায় গান গাইবেন রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, এন্ড্রু কিশোরসহ অনেকে। পি এ কাজল পরিচালিত বাবার আদর শিরোনামের এ চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছেন আইয়ুব বাচ্চু। এ প্রসঙ্গে আইয়ুব বাচ্চু বলেন, ইন্ডিয়ার চলচ্চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করছেন বেশির ভাগই তরুণরা। যুগে যুগে দেখা গেছে, প্রবীণদের চেয়ে তরুণরাই মিউজিকে যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছে সবচেয়ে বেশি। আমাদের এখানে তার উল্টোচিত্র না হলেও যে কয়জন তরুণ চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন, তাদের সবার কাজই প্রশংসিত হয়েছে। আমি বহুবার চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনার অফার পেয়েছি। আমার খুব একটা আগ্রহ জমেনি। এখন চলচ্চিত্রের অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো। তাই রাজি হলাম। চলচ্চিত্র একটি বিরাট মাধ্যম। এ মাধ্যমে কাজ করা খুব সহজ ব্যাপার নয়। আমি চেষ্টা করছি, সব গানই যেন ভালো হয়। সব গানই যেন মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

Bangla Music Tags: , , , , , , ,

Related posts

Post Your Comments

Bangla Music : Incoming search terms