স্টার হওয়া সহজ, স্টার খ্যাতি ধরে রাখা সহজ নয় : বালাম
পুরনো আর প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের পাশাপাশি, কখনো আবার তাদের ছাপিয়ে মাঝে মধ্যেই উঠে আসে প্রতিভাবান নতুন শিল্পী। পুরনোদের অনেকে তা মেনে নিতে না পারলেও নতুনদের অস্বীকার করার উপায় থাকে না কারো। কোনো না কোনোভাবে তারা উঠে আসে এবং জায়গা করে নেয় পুরনোদের মাঝে। এমনই এক নতুন প্রতিভার নাম বালাম। একেবারে আলাদা ধরনের গায়কী স্টাইল, মোহনীয় সুরের জাদু আর ফিউশন টাইপ মিউজিকের সংমিশ্রণে প্রথম সেল্ফ টাইটেলড অ্যালবাম বালাম দিয়ে হই চই ফেলে দিয়েছেন সঙ্গীত অঙ্গনে। সম্প্রতি যায়যায়দিনের চে কাফেতে এসেছিলেন তিনি। তার সঙ্গে কথা বলেছেন টি আই অন্তর। ছবি তুলেছেন শরীফ সারোয়ার।
তারকা খ্যাতি কেমন উপভোগ করছেন?
যদি মনে করি তারকা হয়েছি, বিষয়টা খারাপ লাগছে না। মনে হচ্ছে কিছু একটা করতে পেরেছি। তবে আমার কখনো তারকা হওয়ার গোল ছিল না। শ্রোতারাই আমাকে তারকা বানিয়েছে। শ্রোতারা আমার গান পছন্দ করেছে, আমার ক্রিয়েশনের মূল্য দিয়েছে বলেই আজ আমি এ জায়গায় আসতে পেরেছি। এখন আরো টেনশন বেড়েছে, দায়িত্ব বেড়েছে। এ জায়গাটা ধরে রাখতে হবে। আরো ভালো কিছু করতে হবে। কারণ, তারকা হওয়া সহজ, তারকা খ্যাতি ধরে রাখা সহজ নয়।
গানগুলো করার সময় কি মনে হয়েছিল এ গানগুলোই আপনাকে এ জায়গায় নিয়ে আসবে?
না। এটা আমি চিন্তাই করিনি। গান করতে গিয়ে শুধু গানের কথাই ভেবেছি। অন্য কিছু ভাবিনি। এ গানগুলো মানুষ শুনবে কি না, শ্রোতাদের ভালো লাগবে কি না এমন চিন্তা তখনো মাথায় আসেনি। আমার ধারণা ছিল, গানগুলো মানুষ ধীরে ধীরে শুনবে। শুনতে শুনতে এক সময় হয়তো ভালো লাগবে। আমি সত্যিই ভাবতে পারিনি এতো তাড়াতাড়ি শ্রোতারা আমার গান পছন্দ করে ফেলবে।
এমন কি ছিল এই অ্যালবামে যে শ্রোতারা এতো তাড়াতাড়ি গ্রহণ করেছে?
সেটা আমি নিজেও জানি না। তবে আমি গান করেছি আমার নিজের মতো করে। আমার ভালোলাগা-মন্দলাগা, আমার পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে। কোনো কোনো গান করার পর হয়তো দেখা গেল, গানটা আমার নিজেরই ভালো লাগেনি। তখন সেটা ফেলে দিয়েছি। আবার নতুন করে করেছি। যতোক্ষণ পর্যন্ত কোনো গান আমার নিজেকে তৃপ্তি দিতে পারেনি, ততোক্ষণ পর্যন্ত আমি গানটার পেছনে সময় দিয়েছি। এভাবে প্রতিটি গানেই আমি প্রচুর সময় দিয়েছি। আমার যা ভালো লেগেছে আমি তাই করেছি। অ্যালবাম বের হওয়ার পর দেখলাম, আমার ভালো লাগাটা আমার একার ছিল না, সেটা আরো অনেকের ভালো লাগার সঙ্গেই মিলে গিয়েছে। হয়তো এ কারণেই অ্যালবামটি এ রকম সফলতা পেয়েছে।
সবগুলো গানের সুর ও সঙ্গীত আয়োজন করেছেন আপনি। সুর ও সঙ্গীত নিয়ে আপনার চিন্তা-ভাবনা কেমন ছিল?
সুরের ক্ষেত্রে আমার মাথায় যা এসেছিল আমি তাই করেছি। তবে আমার সুবিধা হয়েছে যে আমি সব ধরনের গান সম্পর্কে জানি। নিজের দেশের গান, আধুনিক বলেন, রাগ সঙ্গীত বলেন, ক্লাসিকাল থেকে পল্লীগীতি এমন কোনো ধারা নেই, যা আমি শুনিনি এবং নিজের মধ্যে ধারণ করিনি। তাই আমি বাংলা গানের সুরের স্টাইল যেমন জানি, তেমনি জানি পাশ্চাত্য সুরের স্টাইল। আমার গানের সুরের ক্ষেত্রে এ দুইটার ব্ল্যান্ডিং ছিল। মিউজিকের ক্ষেত্রে আমি আমার স্টাইল ফলো করেছি। কখনো রক, কখনো পপকে ভেঙে ফিউশন করেছি। তবে সব গানেই আমি মেলোডির প্রাধান্য দিয়েছি।
আপনি একজন নামকরা গিটারিস্ট। অথচ আপনার গানে গিটারের ব্যবহার করেছেন খুবই কম। কারণ কি?
এটা সত্যি, সবাই ভেবেছিল আমি হয়তো গিটার বাজিয়ে মাত করে দেবো। আমাকে যারা চেনে, যারা আমার গিটার প্লেয়িং সম্পর্কে জানে, তারাও আশা করেছিল আমার গানে গিটারের কাজ থাকবে সবচেয়ে বেশি। আমি তা করিনি। কারণ, আমার কাছে প্রয়োজন মনে হয়নি। যেখানে যতোটুকু প্রয়োজন মনে হয়েছে, আমি ঠিক ততোটুকুই গিটার বাজিয়েছি। আমাদের মিউজিশিয়ানদের একটা বড় সমস্যা হচ্ছে, যিনি যে ইনস্ট্রুমেন্ট বাজান, সেই ইনস্ট্রুমেন্টকে প্রাধান্য দিয়ে গান করেন। মনে করেন যে, আমাকে দেখাতে হবে আমি কতো ভালো বাজাই। দিস ইজ রং কনসেপ্ট। আমি মনে করি, মিউজিকের ক্ষেত্রে সবারই পরিমিত বোধ থাকা উচিত।
তুলনামূলকভাবে ভায়োলিনের ইউজ করেছেন বেশি। বাশিরও প্রাধান্য ছিল…?
ভায়োলিন এবং বাশি এ দুইটা ইনস্ট্রুমেন্ট আমার খুবই প্রিয়। আমি বেশ কিছু সফট নাম্বার করেছি, গানের ক্ষেত্রে সফট নাম্বার আমার বেশি পছন্দ। আর সফট নাম্বার গানে ভায়োলিন এবং বাশির ইউজ ভালো লাগে। পুরো অ্যালবামে তাই এ দুইটা ইনস্ট্রুমেন্টের প্রাধান্য দিয়েছি। তবে সেখানেও পরিমিত বোধ ছিল। কোনো গানেই ভায়োলিন কিংবা বাশির ব্যবহার অহেতুক মনে হয়নি। বরং গানের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে এ দুইটা ইনস্ট্রুমেন্ট। বিশেষ করে ভায়োলিন, আমি একটু অন্যভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি এবং মনে হচ্ছে আমি সফল।
সঙ্গীত সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন, হাবিবের গানের স্টাইলের সঙ্গে আপনার স্টাইলের বেশ মিল রয়েছে। আপনার মতামত কি?
হাবিব আর আমি ছোটবেলার বন্ধু। আমরা এক সঙ্গে ব্যান্ড করেছি, স্টেজ শো করেছি। যার ফলে, আমাদের মিউজিক সেন্সের অনেক মিল রয়েছে। ও ব্ল্যান্ড করতে পছন্দ করে, আমিও করি। ও যে সফটওয়ার ইউজ করে, আমিও সেটাই ইউজ করছি। দুইজনের স্টাইলে তাই মিল থাকতেই পারে। তবে হাবিবকে অনুসরণ বা অনুকরণ করিনি। তাছাড়া হাবিব আমার আগে প্রতিষ্ঠিত। যদি আমি হাবিবের আগে প্রতিষ্ঠিত হতাম, তবে হয়তো হাবিবকেই বলতো, সে বালামকে ফলো করছে।
নিজের একক ছাড়াও আপনার করা আরো বেশ কিছু গান রয়েছে। গানগুলো সম্পর্কে বলুন?
মিলার প্রথম অ্যালবামের ফেলে আসা, ছেড়াপাল, পোড়াবাশি এবং নির্জন রাত গানগুলো আমার করা। মিলন মাহমুদের প্রথম অ্যালবামের কি হবে ভালবেসে, বৈশাখ, মাঝিসহ আরো কিছু গান, দ্বিতীয় অ্যালবামের টাইটেল, অভিমানসহ আরো কয়েকটি এবং লাস্ট অ্যালবামের দুটি গান আমার করা। জাহিদ পিন্টু, অভি, আর জুলিকে নিয়ে প্রেম শিকারী নামের একটা অ্যালবাম করেছিলাম, যার সব গানই আমার করা। টাইটেল গান প্রেম শিকারী গেয়েছিলাম আমি। এছাড়া আধার-১ ও আধার-২ অ্যালবামে দুটি গান গেয়েছি। আশিক ফিচারিং বালাম অ্যান্ড সিমিন অ্যালবাম কে তুমি আমার- এ কিছু গান গেয়েছি।
বর্তমানে আর কি করছেন?
একটি টেলিকম কম্পানির জিঙ্গলের কাজ করছি। আমার ছোট বোন জুলির একক অ্যালবামের কাজ করছি। ও খুবই ভালো গান করে। হাবিবের ময়না গো অ্যালবামের টাইটেল গানটি ওর গাওয়া। ওর জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার কিছু গান করবো। আর এ অ্যালবামে বোনাস হিসেবে আমিও একটি গান করার কথা ভাবছি।
এবার একটু পেছনে ফেরা যাক, মিউজিকে কিভাবে এলেন?
আমি বড় হয়েছি পারিবারিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। আমার মা রোকসানা জাহাঙ্গীর এক সময় চট্টগ্রাম বেতারের শিল্পী ছিলেন। বাবা কাজী জাহাঙ্গীর হাফিজ এখনো ঢাকা বেতারের নিয়মিত শিল্পী। চাচা আজাদ হাফিজ রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিল্পী। চাচী ডালিয়া নওশীন নজরুলগীতির শিল্পী। আমার কাজিনরাও গান করে। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় আমি গিটার শেখা শুরু করি। এইটে কি নাইনে পড়ার সময় কৈশোর নামে একটা গানের সুর করি, পরে গানটি ওয়ারফেইজের প্রথম অ্যালবামে স্থান পায়। এসএসসি পরীক্ষার পর হাবিব, রিপন, শহীদ আর আমি মিলে রেনেগেইটস নামে একটা ব্যান্ড করি। ৯৯ সালে জয়েন করি ওয়ারফেইজে।
ওয়ারফেইজে গিটারিস্ট হিসেবে জয়েন করলেও আপনি বেশ কিছু গানও গেয়েছেন…?
সঞ্জয় এবং বাবনা চলে যাওয়ার পর ওয়ারফেইজে একটা শূন্যতা সৃষ্টি হয়। ওই সময় আমি কিছু গান করেছি। তার মধ্যে আলো অ্যালবামে চারটি গান, এগুলোর মধ্যে আমার গাওয়া যতো দূরে থাকো গানটি বেশ শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। আর ওয়ারফেইজের সর্বশেষ অ্যালবাম মহারাজের সবগুলো গানই আমি গেয়েছি।
ওয়ারফেইজ ছেড়ে সলো গান করা শুরু করলেন কেন?
ওয়ারফেইজ একটা রক ব্যান্ড। ব্যান্ডে থেকে রকের বাইরে অন্য কোনো গান করা সম্ভব নয়। আমার আইডেনটিটিও দাড়িয়েছে রক সিঙ্গার হিসেবেই। কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই আমি মিশ্র সঙ্গীত ঘরানার ভেতর বড় হয়েছি। যার ফলে, আমার মাথায় নানা ধরনের গান খেলা করে, যেগুলো আমি আমার ব্যান্ডে করতে পারছিলাম না। সে গানগুলো করার জন্যই ব্যান্ড ছাড়া একক গান করা। তবে ওয়ারফেইজকে আমি এখনো ভালোবাসি। এখনো ওয়ারফেইজের সব সদস্যের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক রয়েছে।
সূত্রঃ যায়যায়দিন।
Bangla Music Tags: Balam, Habib Wahid, Mila, Warfaze, ওয়ারফেইজ, বালাম, মিলা, হাবিব ওয়াহিদ
Post Your Comments