খিদে ছিল নিত্যসঙ্গী। বাবা মধু বয়াতির দুই সংসার। গান গেয়েই সংসার চালাতে হয়। গান তো আর সব সময় হয় না। গানেরও আছে মৌসুম। গান না থাকলে খাবারও জোটে না। ছোটবেলা থেকেই ‘অভাব’ শব্দটি অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল মমতাজের।
বাবা একতারা, দোতারায় সুর তোলেন। ডুবে যান গানের মধ্যে। শিশু মমতাজ নিজের মনে তুলে নেয় সেই গান। মা-বাবা জানতেই পারেন না, মমতাজ গানের রাজ্যেই দিয়েছে ডুব। কোনো দিন বাবার কাছে এসে গান শিখতে চায়নি মেয়ে। কিন্তু সব সময় গুনগুন গুনগুন।
খুব খারাপ কাটছিল দিন। হতাশ বাবা ফিরছেন বাড়ি, হঠাৎ শোনেন ঘর থেকে ভেসে আসছে গানের সুর। দরজার কাছে এসে থমকে দাঁড়ান মধু বয়াতি। ছয় বছর বয়সী মমতাজ গাইছে এই গান! এ রকম সুরেলা কণ্ঠ! মধু বয়াতি আর ঘরে ঢোকেন না। ভাবেন, মেয়েটার মনে অনেক দুঃখ। বাবা হয়ে মেয়ের দুঃখ দূর করতে না পারার কষ্ট বুকে নিয়ে মধু বয়াতি বেরিয়ে যান বায়নার খোঁজে। বাবা পরে বলেছিলেন এ কথা।
কারও কাছে গান শেখেননি মমতাজ। অভাব-অনটনে পেটের খিদে বাড়ে, গানে মেটে মনের খিদে। বাবা ঢাকার মিরপুরে আসতেন বায়নায় গান করতে। মমতাজ বায়না ধরল, সেও ঢাকায় আসবে। ওকে নিয়ে আসা হলো। চলছে গান। এবার ছয় বছরের মমতাজের গোঁ, ‘আমি গান করব।’ ইসলাম সরকার নামে এক বড় বয়াতি ছিলেন, তাঁর কাছেই জানাল আরজি। আরজি গৃহীত হলো। কিন্তু বাবা তো ছাড়বেন না। হাজার হাজার মানুষের সামনে এই পুঁচকেটা কী গান করবে! স্টেজে মাইকের সামনে সেই শিশুটি, অনটন যার বন্ধু, ‘আমি ভাবছিলাম কি এইভাবে দিন যাবে রে···’ বলে শুরু করল সে। তাল-লয়ে কোনো ভুল নেই। শ্রোতা-দর্শক মঞ্চের দিকে তাকায়। এত ছোট মেয়ে, ওকে দেখাই যায় না। গান শেষ হতেই শ্রোতারা ওকে দেখতে চায়। মঞ্চ ভরে ওঠে ছুড়ে দেওয়া টাকায়।
সেদিন বুঝি প্রথম বদলে গেলেন মমতাজ। বুঝতে পারলেন, গানের সুরেই জীবন বাঁধা তাঁর।
সংগীত তো সাধনা। চাইলেই কি সিদ্ধি লাভ সম্ভব? এ প্রশ্ন এল মধু বয়াতির মনেও। বললেন, গান শিখতে হলে গুরু লাগবে। মাতাল রাজ্জাক দেওয়ানের কাছেই শিখতে হবে গান। তিনি নিজে লেখেন, সুর করেন, কণ্ঠে ধারণ করেন। থাকেন ঢাকায়। মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান বললেন, গান তো আর মানিকগঞ্জে থেকে এসে শেখা যাবে না। শিখতে হবে কাছে থেকে। সেই থেকে বাবার সঙ্গে ঢাকায় বেশির ভাগ সময় থাকা আর মাতাল রাজ্জাকের কাছে গান শেখা।
ছোট মেয়েটা তখন গান করছে। বাবার বয়স হচ্ছে। মাঝরাত পর্যন্ত পালাগান হয়, এরপর ভরা আসরে মমতাজ করে গান। বাবার কাছ থেকে পালাগান শিখে নেওয়ার পর গান-যুদ্ধেও নেমে পড়ে। বায়না করতে এলেই মাতাল রাজ্জাক বলতেন, ‘এই মেয়েটিও আমার সঙ্গে গাইবে। ওর সঙ্গে বায়না করতে হবে না। গান ভালো লাগলে টাকা দেবেন, না হলে দেবেন না।’ দেখা গেল, মেয়েটির গান ভালো লাগছে শ্রোতাদের। এর পর থেকে সোজা বায়না আসতে লাগল মমতাজের নামে।
আরেকটু বদলে গেলেন মমতাজ। এখন নিজের টাকা! এর মধ্যে বাবার বসন্ত হয়েছিল। চোখে পড়েছিল ছানি। অর্থের অভাবে অস্ত্রোপচার করা যাচ্ছিল না। মমতাজ এবার ঢাকার একটি হাসপাতালে বাবার চোখের ছানি অপসারণ করালেন। নিজের ওপর বিশ্বাস এল তাঁর।
এরপর শুধু গান আর গান। দেশের সব এলাকা চষে বেড়াতে লাগলেন মমতাজ। বদলে গেল জীবন। এখন আর অভাব-অনটন নেই। এখন খাবারের জন্য ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিতে হয় না নিজেকে।
অনেকেই বলে, ক্যাসেট করেন না কেন? ক্যাসেট? কে করবে ক্যাসেট? পালাগান, বিচ্ছেদি গান শোনে গ্রামের মানুষ। আসরে বসে শোনে। তারা কি ক্যাসেট শুনবে? তার পরও যোগাযোগ করা হয় ক্যাসেট কোম্পানিগুলোর সঙ্গে। ওরা কেউই গা করে না। কোথাকার কোন মমতাজের জন্য কেন ক্যাসেট করবে তারা? শেষে জনি ইলেকট্রনিকস থেকে জানানো হলো, একটা ক্যাসেট ওরা বের করতে পারে। কিন্তু ওদের মনে সংশয়, যদি বিক্রি না হয়! মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান বলেন, ‘আমাদের যে ক্যাসেটগুলো দেবেন, সেগুলো বিক্রি করেই আপনাদের টাকা পরিশোধ করে দেব।’ ১৯৯২ সাল সেটা। জনি ইলেকট্রনিকসে গান রেকর্ডিং করতে গিয়ে দেখা গেল এক শিফটের কাজ আধ শিফটেই শেষ। ওরা বলল, আর কোনো গান আছে? আর আধ শিফটে হতে পারে আরেকটি ক্যাসেট। তথাস্তু। আর একটি ক্যাসেটের গান রেকর্ড হয়ে গেল। এই ক্যাসেট দুটি ওঁরা নিয়ে যেতেন গানের আসরে। বিক্রি হয়ে যেত দেদারসে। অল্প দিনেই উঠে এল টাকা। তারপর আরও ক্যাসেট। আরও বিক্রি। এর পর থেকে শুধু ক্যাসেট করা আর দেশের সর্বত্র ঘুরে ঘুরে গান করা।
আরেকটু বদলে গেলেন মমতাজ। কী করে যে ক্যাসেটের সংখ্যা ৩৫০ ছাড়িয়ে গেল, তা ভেবে অবাকও হলেন।
তখনো টেলিভিশন বা বেতার কিংবা চলচ্চিত্রের কথা ভাবার অবকাশই নেই মমতাজের। হানিফ সংকেত বহু দিন ধরে খুঁজছিলেন তাঁকে। তাঁরই ইত্যাদি অনুষ্ঠানে গান করলেন মমতাজ। একই দিন রেকর্ডিং করলেন খন্দকার ইসমাইলের বহুরূপী অনুষ্ঠানেও। প্রথম গানটি ছিল ‘রিটার্ন টিকিট হাতে লইয়া আইসাছি এই দুনিয়ায়’, অন্যটি ‘ও গাড়িওয়ালা, তোমার সঙ্গে করব আমি ভাব’। পর পর দুই দিন দুটি টিভি অনুষ্ঠানে বাজল মমতাজের গান। সাড়া পড়ে গেল।
এরপর একই সঙ্গে চলতে থাকল মঞ্চ, টেলিভিশন, চলচ্চিত্রে গান গেয়ে যাওয়া। এরই মধ্যে অ্যাকুস্টিক বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রের সঙ্গতেও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন মমতাজ। ২০০০ সালে প্রথম সরকারি সাংস্কৃতিক সফরে গেলেন অস্ট্রেলিয়া। গাইলেন গান। এ সময় থেকেই ভাবছিলেন, টাকা-পয়সা তো অনেক হলো, এবার মানিকগঞ্জবাসীর জন্য কিছু করতে হবে। মনে পড়ল অসহায় বাবার মুখটা। পয়সার অভাবে যাঁর চোখের চিকিৎসা ঠেকে গিয়েছিল অনেক দিনের জন্য। মানিকগঞ্জে কত দুঃখী মানুষ আছে, যাদের পক্ষে ঢাকায় এসে চিকিৎসা করানো সম্ভব নয়। ২০০৪ সালের ৭ জানুয়ারি মানিকগঞ্জেরই একটি ভাড়া করা বাড়িতে করলেন ‘মমতাজ চক্ষু হাসপাতাল’। এখন সেই ছোট্ট হাসপাতালটি বড় হয়েছে। ৫০টি শয্যা সেখানে। আরও কিছু করার ইচ্ছে জাগল। এবার মানিকগঞ্জের জয়মন্টপের নিজ গ্রামে করলেন ‘মমতাজ শিশু ও চক্ষু হাসপাতাল’। এ কথা বলতে গিয়ে মমতাজের চোখে কি একটু জলের আভাস? কণ্ঠ কি একটু কেঁপে উঠল? আসলে সেই বাড়িতেই হাসপাতালটি করেছেন, যেটি নিজের প্রথম বড় আয়ের টাকা জমিয়ে করেছিলেন। মা-বাবাকে তিনি কথা দিয়েছিলেন, তাঁদের আর দুঃখ-কষ্টের মধ্যে রাখবেন না। সেই বাড়িতেই এখন হাসপাতাল। মা-বাবার ইচ্ছা পূরণ করতে পেরে খুব ভালো লাগছে মমতাজের।
মানুষের জন্য কিছু করতে পারার ইচ্ছে প্রবল হলো। গানই আয়ের উৎস, কিন্তু তা শুধু নিজের জন্য নয়, ছড়িয়ে দিতে হবে মানুষের জন্যও-এ ভাবনায় অটল থেকে আরেকটু বদলে গেলেন মমতাজ।
এরপর এল আরেকটি বদল। রাজনীতি। ১৯৯২ সালেই অবশ্য মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলা আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন, থানা আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদিকাও ছিলেন ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত। কিন্তু গানের কারণে রাজনীতিতে সময় দেওয়া কমে গিয়েছিল। এখন তিনি আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছেন রাজনীতিতে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চেয়েছেন, মমতাজ সক্রিয় রাজনীতিতে আসুন। শিল্পীদের কথা, মানুষের কথা বলুন তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের একটি এখন তাঁর। ২৯ মার্চ শপথ নিয়েছেন, এরপর দুবার সংসদে দাঁড়িয়ে শিল্পীসমাজের সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন, এলাকার সমস্যার কথা বলেছেন। আরও বলবেন।
বিদায়ের সময় মমতাজ বললেন, ‘আসলে, শুধু মানিকগঞ্জই নয়, আমাদের পুরো দেশটাতেই দুঃখী মানুষের বসবাস। সবার ভাগ্য পরিবর্তন করার কথাই আমাদের ভাবা দরকার।’
একসময় খিদে ছিল যাঁর নিত্যসঙ্গী, অভাব-অনটন ছিল যাঁর অলংকার, তিনি এখন নিরন্ন দেশবাসীর জীবন বদলে দেওয়ার কথা ভাবছেন। মমতাজ বদলে গেছেন-ইতিবাচক অর্থে। বদলে দিতে চান সাধারণ মানুষের জীবন। তাঁর স্বপ্ন পূরণ হোক।
জাহীদ রেজা নূর
Tags: মমতাজ
Related News:
she is not perfect person to be a parlament mamber because she doesnt have any education which is very important for this particular post.
The national parliament is the most important place where all the core decisions are made for the nation. Momtaz may has sweet voice but this voice has no value as a parliament member. She is ignorant and she has no caliber and quality to be an M.P. She is totally disqualified for that position. If the decision makers are such infit persons, we afraid the future of Bangladesh.
It is shame that she is a MP of JS. What she can do there .?
see can not do it because see not aducatted person.bangladesh awamilig is nonsence so see is mp