Please Donate

Other Links

সঙ্গীতের শিক্ষাগুরু ওস্তাদ সঞ্জীব দে

Sanjib Deyনিজে শিল্পী নন, কিন্তু অনেক শিল্পী তৈরি করেছেন তিনি। তার হাতে হাতেখড়ি হয়েছে অনেক নামিদামি শিল্পীর, যাদের অনেকে আজ বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত বিশেষ গ্রেডের শিল্পী, কেউ কেউ বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির শিক্ষক, কেউ কেউ দখল করেছেন সঙ্গীতের সর্বোচ্চ আসর অডিও বাজার এবং অনেকেই পর্দা কাপাচ্ছেন ভিজুয়াল মিডিয়ার। অথচ তিনি রয়ে গেছেন পর্দার আড়ালে। কিন্তু কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুজতে যায়যায়দিনে নিমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল তাকে এবং সম্প্রতি যায়যায়দিনের চে কাফেতে এসেছিলেন সঙ্গীতের শিক্ষাগুরু ওস্তাদ সঞ্জীব দে। লিখেছেন টি আই অন্তর ও ছবি তুলেছেন শরীফ সারওয়ার

আপনার শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই এ দেশের মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত, কিন্তু আপনি রয়ে গেছেন অনেকটাই আড়ালে, কারণ কি?

কারণ, আমরা যারা গানের শিক্ষক তাদের কাজটাই আড়ালের। আড়ালে থেকে একজনকে শিল্পী হিসেবে তৈরি করাই আমাদের আসল কাজ। নিজেকে প্রকাশ করার কোনো রকম মোহ থাকে না আমাদের; আমরা নেপথ্যের লোক, নেপথ্যে থাকতেই পছন্দ করি। তাছাড়া ব্যক্তিগতভাবে আমি কিছুটা অন্তর্মুখী স্বভাবের, নিজেকে মেলে ধরা বা আড়াল থেকে বের করে আনা আমার স্বভাববিরুদ্ধ। আমার শিক্ষার্থীদের অনেকেই যে নিজেদের পরিচিত করে তুলতে পেরেছে মানুষের কাছে, এ দেশের প্রতিটি মানুষ যে তাদের চেনে, এটাই আমার সুখ, এটাই আমার তৃপ্তি। আমি তো ওদের মাঝেই বেচে আছি, ওদের মাঝেই বেচে থাকবো।

আপনার অসংখ্য শিক্ষার্থীর মধ্যে কিছু সংখ্যক পরিচিত নাম বলুন?

শাকিলা জাফর, আলম আরা মিনু, ডলি সায়ন্তনী, আখি আলমগীর, ঝুমু খান, ঈশিতা, পারভীন সুলতানা, শেখ ইশতিয়াক, বাদশা বুলবুল, এস ডি রুবেল, ইমন সাহা, ইবরার টিপু, ওয়াকার চৌধুরী, ড. ইকবাল। এ রকম আরো অনেকেই তো আছে।

আপনি তো ছায়ানটে শিক্ষকতা করতেন, সেটা ছাড়লেন কেন?

ছায়ানটে আমি ১৯৭৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেছি। যে কোনো প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষকতা করার কিছু নিয়ম-কানুন থাকে, সিলেবাস থাকে, রুটিন থাকে। কিন্তু গান শেখানোর বিষয়টা আসলে নিয়ম মেপে হয় না, বাধাধরা সময় নিয়ে হয় না। সেখানে শিক্ষকের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা থাকতে হয়। নিজের মতো করে, সময় নিয়ে শেখানোর মতো সুযোগ থাকতে হয়। আর এতো ছাত্রছাত্রীকে এক সঙ্গে শেখাতে গিয়ে কারো দিকেই ভালোভাবে নজর দেয়ার ফুরসত থাকে না। এ সব কারণে একটা সময়ে ছায়ানট ছেড়েছি। তবে সেটা ছায়ানটের ওপর কোনো মান-অভিমান, রাগ বা ক্ষোভ থেকে নয়।

ছায়ানটের মতো আমাদের দেশে আরো অনেক গানের স্কুল রয়েছে। এসব স্কুলের শিক্ষা ব্যবস্থা কতোটা মানসম্মত বলে মনে হয়?

সব স্কুলের না হলেও কিছু কিছু স্কুলের শিক্ষা ব্যবস্থা মোটামুটি মানসম্মতই বলা যায়। তবে এসব প্রতিষ্ঠানেরও কিছু দুর্বলতা রয়েছে। অনেক পুরনো আর নামকরা হওয়ায় দেশের বেশির ভাগ অভিভাবকই তাদের সন্তানদের হাতে গোনা এ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করান। ফলে এসব স্কুলের শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক। আর এতো বেশি শিক্ষার্থী হওয়ায় শিক্ষকদের একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থীকে শিক্ষা প্রদান করতে হয় বলে কোনো শিক্ষার্থীর প্রতি আলাদা নজর দিতে পারেন না শিক্ষকরা। শিক্ষকদেরও অনেস্টলি টেক কেয়ারের অভাব আছে কিছুটা।

এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সত্যিকারের প্রতিভাবান শিল্পী বের করে আনার জন্যে কি করা উচিত বলে মনে করেন?

এসব স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা, ম্যানেজিং কমিটিগুলোর উচিত ক্লাসে অল্প সংখ্যক ছাত্রছাত্রী রাখা। প্রয়োজনে ক্লাসের সংখ্যা বাড়ানো। প্রতিটি ডিপার্টমেন্ট থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীদের আলাদা করে বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করা। শিক্ষক নির্বাচনেও যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা। সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত, আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থার নিশ্চয়তা প্রদান করা।

নিবেদন নামে ভিন্ন একটা গানের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আপনি। সেটার কি অবস্থা?

সেটা এখন আর নেই। ১০-১২ বছর আগে আমি, অনুপ ভট্টাচার্য, কলিম শরাফী, সুবীর নন্দী এবং বিশ্বজিৎ রায় মিলে এ স্কুলটা প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। স্কুলটি ৫ বছর টিকেছিল। প্রায় ১০০ জনের মতো ছাত্রছাত্রী ছিল। এক সময় সুবীর নন্দী ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে পড়ায় সে আর ক্লাস নিতে পারছিল না। ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক সমস্যার কারণে অনুপ এবং বিশ্বজিৎও ঠিকমতো সময় দিতে পারছিল না। বার্ধক্যজনিত সমস্যার কারণে কলিম শরাফীও যথেষ্ট সময় দিতে পারছিলেন না, পরে তিনি অবশ্য আরেকটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সব মিলিয়ে একটা সময় আমাদের স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত আমি আর কোনো স্কুলে শিক্ষকতা করিনি।

এখন তো আপনি ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষকতা করছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আর ব্যক্তিগত শিক্ষার মধ্যে কোনটা বেশি কার্যকর মনে করেন।

সঙ্গীত আসলে গুরুমুখী শিক্ষা। সে ক্ষেত্রে একজন গুরুর কাছে শিক্ষার্থী যতোটা শিখতে পারে, কোনো প্রতিষ্ঠানে ঠিক ততোটা শেখার সুযোগ নেই। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা ব্যক্তিগত শিক্ষায় নেই। তাই আমি বলবো ব্যক্তিগতভাবে শেখাটাই বেশি কার্যকর।

সূত্রঃ দৈনিক যায়যায়দিন।

Post Your Comments

Bangla Music : Incoming search terms