যিনি আধুনিক বাংলা গান করেন, তাঁর মনে কি রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়ার ইচ্ছে থাকতে পারে না? সে রকম ইচ্ছে নিয়েই আধুনিক গানের অনেক শিল্পী রবীন্দ্রসংগীতের হাজার সুরের দ্যোতনায় মিলিয়েছেন নিজেকে। এই তো সেদিন কলকাতার সায়েন্স সিটির সুবিশাল প্রেক্ষাগৃহে হলো ‘পঞ্চকন্যা’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠান। উপমহাদেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আশা ভোঁসলে ভারতের মূল শিল্পী হিসেবে কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেদিনের অনুষ্ঠানে ‘জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ’ একক নিবেদনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন তিনি। এরপর করজোড়ে বিনম্র ভঙ্গিতে বলেন, গুরুদেবের গান গাওয়া সহজ নয়!
জীবনমুখী গানের আবহ ছড়িয়ে সংগীতের জগতে ঠাঁই করে নিয়েছেন কবির সুমন। তিনিও গেয়েছেন রবীন্দ্রসংগীত। সে কথা পরে। বাংলাদেশে আধুনিক গানের শিল্পীদের অনেকের মধ্যেই রবীন্দ্র-অনুরাগী হয়ে রবীন্দ্রসংগীত করার প্রবণতা দেখা গেছে নানা সময়ে। অনেকে সফলও হয়েছেন। ’৯৮ সালে আধুনিক গানের শিল্পী তপন চৌধুরী পূর্ণাঙ্গ রবীন্দ্রসংগীতের অ্যালবাম করে রীতিমতো সাড়া ফেলে দেন। তাঁর হিয়ার মাঝে প্রাণের মানুষ শিরোনামের অ্যালবামটি সে সময় বাজারে ছেড়েছিল প্রযোজনা-প্রতিষ্ঠান সাউন্ডটেক। অ্যালবামের প্রসঙ্গে তপন চৌধুরী জানান, আলোচিত ওই অ্যালবামে তিনি বরেণ্য রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার সঙ্গে ‘আমি তোমারই সঙ্গে বেঁধেছি আমার’, ‘আমার পরান যাহা চায়’ শিরোনামের দুটি দ্বৈত গানে কণ্ঠ দিয়েছেন।
এই তো গত সপ্তাহে একক রবীন্দ্রসংগীতের অ্যালবাম বের হলো আধুনিক গানের জনপ্রিয় শিল্পী সামিনা চৌধুরীর। তোমার খোলা হাওয়া শিরোনামের একক অ্যালবামটি প্রকাশ করেছে প্রযোজনা-প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড মিউজিক। সামিনা চৌধুরী জানান, দীর্ঘদিনের সংগীতজীবনে তাঁর এই একক অ্যালবামটি একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা, যা অনেক পরিকল্পনা করে, অনেক সময় ও যত্ন নিয়ে করেছেন তিনি। সামিনা বলেন, ‘গাইতে গিয়ে বুঝেছি, এটা কত কঠিন একটি কাজ। চেষ্টা করেছি বাণী ও সুরকে যথাযথ রেখে গাইতে। ভবিষ্যতে অ্যালবাম করি না-করি, রবীন্দ্রনাথে আমি আজীবন থাকব।’
সংগীতশিল্পী ফাহমিদা নবী ও কুমার বিশ্বজিৎ মূলত আধুনিক গান করেন। মাঝেমধ্যে লোক ঘরানার গান শোনা গেছে তাঁদের কণ্ঠে। একবার এই দুই শিল্পীর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথকে পাওয়া গেল। কুমার বিশ্বজিৎ ও ফাহমিদা নবী রবীন্দ্রনাথের ‘আমার বেলা যে যায়’ গানটি নাটকের জন্য গেয়েছিলেন দুই বছর আগে। রবীন্দ্রনাথের গল্প নিয়ে লেখা নষ্টনীড় নাটকের গানটি দর্শক-শ্রোতার মধ্যে দারুণ সাড়া ফেলেছিল। পরে কুমার বিশ্বজিৎ তাঁর একক অ্যালবামে গানটি রেখেছিলেন।
কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, ‘আধুনিক গান করলেও আমি গান বুঝেছি রবীন্দ্রনাথ শুনে। সেই সীতাকুণ্ডের শৈশবে আমাদের ঘরে রবীন্দ্রনাথ আসতেন কখনো হারমোনিয়াম, কখনো ফিতা কিংবা লং প্লেতে বন্দী হয়ে। মনের মন্দিরে সেই যে কবিগুরু বাসা বেঁধেছিলেন, আজও আছেন। তাই সুযোগ পেলেই রবীন্দ্রনাথের গান করি, আজীবন করব।’
সংগীতশিল্পী ফাহমিদা নবী জানান, নাটকসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে আনুষ্ঠানিকভাবে একাধিক রবীন্দ্রসংগীত করলেও তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যালবামের কাজ ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, নিয়মিত চর্চা না করলেও আমাদের পরিবারের সবার মনে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন, আছেন। শিগগিরই ফাহমিদা নবীর রবীন্দ্রসংগীতের অ্যালবাম দেখা যাবে।
আধুনিক গানের শিল্পীদের অনেককেই মঞ্চেও রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করতে দেখা যায়। মঞ্চে অনেকবার রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে শোনা গেছে আধুনিক গানের জনপ্রিয় শিল্পী বেবী নাজনীনকে। এ বছরই তিনি কবিগুরুর ‘তুমি কোন কাননের ফুল’ গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন।
রবীন্দ্রজয়ন্তী কিংবা রবীন্দ্রপ্রয়াণ সামনে রেখে বিভিন্ন গানের শিল্পীদের দেখা যায় টেলিভিশন অনুষ্ঠানের জন্য রবীন্দ্রসংগীত করতে। গত বছর একটি চ্যানেলে পপগায়িকা তিশমাকে একটি রবীন্দ্রসংগীতে কণ্ঠ দিতে দেখে দর্শক রীতিমতো অবাকই হয়েছে। পর্দায় দেখা গেল শাড়ি পরিহিত পুরোদস্তুর রাবীন্দ্রিক সাজে তিশমাকে। তিশমা বলেন, ‘আমি রীতিমতো ভয়ে ভয়ে সেদিন গান করেছিলাম। উচ্চারণ কিংবা গায়কির ব্যাপারে অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত একটি রবীন্দ্রসংগীত গাইতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে হয়েছে।’
মূলত পপগানের চর্চা করলেও শিল্পী মেহ্রীনকেও টেলিভিশনে দেখা গেছে রবীন্দ্রসংগীত গাইতে। মেহ্রীন বলেন, “আমার কাছে রবীন্দ্রসংগীত অনেকটা প্রার্থনার মতো। সুধীন দাসের কাছে রবীন্দ্রসংগীতের কিছুটা তালিম নিয়েছিলাম। তাই বলে অনুষ্ঠানে বিশ্বকবির গান করব, এতটা স্বপ্ন দেখিনি। আমার কণ্ঠে ‘এ মণিহার আমার নাহি সাজে’ রবীন্দ্রসংগীতটি শুনে অনেকেই প্রশংসা করেছেন।”
রবীন্দ্রসংগীত করে সমালোচিত হয়েছেন এমন ঘটনাও ঘটেছে। বেশ কয়েক বছর আগের কথা। ব্যান্ডতারকা মাকসুদ নিজের মতো করে গাইলেন একটি গান। ব্যস, সমালোচনার ঝড় বয়ে গেল। শুদ্ধ রবীন্দ্রসংগীত যাঁরা চর্চা করেন, তাঁরা মাকসুদের গাওয়া এই গানটি মেনে নিতে পারেননি।
বাংলাদেশের মতো ভারতের কলকাতায়ও অন্য গানের শিল্পীদের কণ্ঠে শোনা যায় রবীন্দ্রনাথের গান। কয়েক বছর আগে জনপ্রিয় শিল্পী নচিকেতাও গান গেয়ে সমালোচনায় পড়েছিলেন। সম্প্রতি ঢাকায় আনন্দর মুখোমুখি হয়ে নচিকেতা জানান, শুধু রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে পরীক্ষামূলক পূর্ণাঙ্গ একটি অ্যালবাম তিনি করছেন, যা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হবে।
শিল্পী কবির সুমনকে হরহামেশা দেখা যায় অ্যাকুস্টিক গিটার দিয়ে রবীন্দ্রসংগীত করতে। কলকাতায় ইন্দ্রনীল, শুভমিতা, অঞ্জন দত্তসহ প্রায় সব শিল্পী বিভিন্ন সময় রবীন্দ্রচর্চা করেছেন নিজেদের মতো করে।
রবীন্দ্রনাথের গান করেননি এমন বাংলা গানের শিল্পী নগণ্য। তবে রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী মিতা হক বলেন, রবীন্দ্রনাথের গানের ভাব, আবেদন ঠিক রেখে গাওয়াটা খুব জরুরি।
মাসুম অপু
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, আগস্ট ০৬, ২০০৯
Tags: অঞ্জন দত্ত, কবির সুমন, কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরী, তিশমা, নচিকেতা, ফাহমিদা নবী, বেবী নাজনীন, মিতা হক, রবীন্দ্রসংগীত, সুধীন দাস, সুমন
Related News:
Leave a Reply