‘ভাওয়াইয়া গান’ বলতেই যে কণ্ঠ ও মুখটি ভেসে ওঠে, সেটা শিল্পী ফেরদৌসী রহমানের। ভাওয়াইয়া গানের অতীত ও বর্তমান নিয়ে এই প্রিয় শিল্পী কথা বলেছেন আনন্দ-এর সঙ্গে।
ভাওয়াইয়া—আপনার কণ্ঠে গীত এই গান এখনো শ্রোতার হূদয় ছুঁয়ে আছে। ভাওয়াইয়া গানের প্রতি কীভাবে এই ভালোবাসা তৈরি হলো?
এ দেশে ভাওয়াইয়া গান নিয়ে প্রথম কাজ করেন আমার আব্বা (আব্বাসউদ্দীন আহ্মদ)। কুচবিহার, জলপাইগুড়ি, দিনাজপুর, রংপুর—পুরো উত্তরবঙ্গে ছিল ভাওয়াইয়া গানের চর্চা। বলা যায়, এ অঞ্চলই ভাওয়াইয়া গানের পীঠস্থান। পশ্চিম বাংলার কিছুটা অংশ এর সঙ্গে ছিল। তাই জন্মের পর থেকেই এ গান শুনে আমার বেড়ে ওঠা। অন্যান্য গানের তুলনায় ভাওয়াইয়া গান বেশি মর্মস্পর্শী, বিচ্ছেদি আর বিরহমাখা। এককথায়, এ গানের আবেদন অন্য রকম। গানের কোথাও কোথাও গলা ভাঙাটা এ গানের বিশেষত্ব। একটু টানা গান বলেই ভাওয়াইয়া। আবার একটু দ্রুতলয়ের হলে সেটা হয়ে যায় চটকা।
একটু জানা প্রয়োজন, শিল্পীর গায়কিতে এই কণ্ঠ ভাঙাটার কারণ কী?
এটা স্বাভাবিকভাবে আসে। আসলে উত্তরবঙ্গে নদী কম। কাঁচা রাস্তা। ধূলিময় পথ। বৃষ্টির দিনে কর্দমাক্ত, শীতকালে আবার খরখরে রাস্তা। গরুর গাড়িতে চড়ে যেতে যেতে কেউ গান গাইছে। তখন গানের মধ্যে এ রকম ভাঙা আবেগটা এসে যায়।
বলছিলেন এই গানের প্রতি ভালোবাসার কথা…
আব্বার জন্ম কুচবিহারে। গলায় ভাওয়াইয়া গান বসে আছে। অথচ কলকাতায় যাওয়ার পর তাঁকে গাইতে হতো নজরুলসংগীত। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভাওয়াইয়া গান করার তৃষ্ণা তাঁর। তাই গ্রামোফোন কোম্পানির একজন কর্ণধারকে বেশ কবার এই গান রেকর্ড করার জন্য অনুরোধ করেন। তিনি জবাবে বললেন, এগুলো গ্রাম্য গান। চলবে না। আব্বাও দমে যাওয়ার মানুষ নন। বুঝিয়ে-সুঝিয়ে একটি গান ঠিকই রেকর্ড করালেন। রেকর্ড বের হলো। শহরের মানুষ লুফে নিল। এরপর এ গান নিয়মিত রেকর্ড হতে থাকল।
এই গানগুলো কারা লিখতেন?
বেশির ভাগই প্রচলিত। তবে আব্বা তো নতুন নতুন গান করতেন। এ কারণে ওই সময় আমার চাচা আবদুল করিম অনেক গান লিখেছিলেন। সেসবের অনেকগুলো বেশ শ্রোতাপ্রিয়ও হয়েছে। যেমন—‘আজি ভাল করিয়া বাজান গো দোতরা, সুন্দরী কমলা নাচে।’ হরলাল রায়ও (শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়ের বাবা) বেশ কিছু গান লিখেছেন। তবে আব্বা উত্তরবঙ্গের অনেক শিল্পীকে দিয়ে এ ধরনের গান রেকর্ড করিয়েছেন। আমি রেডিওতে প্রথম ১৯৫৬ সালে ‘ও মোর চান্দেরে মোর সোনা’ ভাওয়াইয়া গানটি গাই। আব্বা সেই গান শুনে তো আমি আব্বার কাছে এ গান শিখিনি। আসলে আমার বা আব্বাসী ভাইয়ের (মুস্তাফা জামান আব্বাসী) রক্তের মধ্যেই এ গান ছিল। আর এ গানের প্রতি ভালোবাসা সারা জীবন থাকবে। এ গানের কথা ও সুরে এমন চমত্কার মেলবন্ধন যে, দেশে-বিদেশে যেখানেই এ গান গেয়েছি, সেখানেই গানগুলো দর্শক-শ্রোতাকে আকর্ষণ করেছে।
একসময় এর নিয়মিত চর্চা ছিল। এখন ভাওয়াইয়া গানের চর্চা আগের মতো নেই কেন?
উত্তরবঙ্গে এখনো কিন্তু এর চর্চা রয়েছে। তবে আগের মতো নয়। সত্যি কথা বলতে, কেউ ভাওয়াইয়া গানে সে রকম আবেদন তৈরি করতে পারছে না। রংপুর ও দিনাজপুর বেতারে অনেকেই ভাওয়াইয়া গাইছে।
আসলে আগে লোকগান নিয়ে বড় উত্সব হতো। বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পীরা এসে সারা রাত গান করত, উদ্দীপনা সৃষ্টি করত। আজকাল সে রকম আয়োজনও নেই, উত্সাহও নেই। আগে এ ধরনের উত্সব শুনলে প্রস্তুতি নিতাম। এ দেশে ফোক ও উচ্চাঙ্গসংগীত অনেক অবহেলিত। এসবের পৃষ্ঠপোষকতা নেই। অনেক হালকা গানে সবাই ঝুঁকে গেছি।
অনেক শিল্পীর কণ্ঠেই ভাওয়াইয়া শুনছি। মূল গান থেকে গায়কি ও সুর কিছুটা পরিবর্তন করা। আপনার অভিমত কী?
হ্যাঁ। ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না’ গানটি কেউ কেউ গায়। ভুলভ্রান্তিও হয়। তারা একটু ভালোভাবে শিখলেই আরও ভালো গাইত। সিলেটি বা ফোকগান অনেকেই আধুনিক যন্ত্রায়নে গাইছে। ব্যান্ডের শিল্পীরা ফোকগান গাইলেও ভাওয়াইয়া গান নিয়ে এখনো তারা টানাহেঁচড়া করেনি।
ভাওয়াইয়া গান ধরে রাখতে কী করা উচিত?
এ দেশে ভাওয়াইয়া বা উচ্চাঙ্গসংগীত বেশ অবহেলিত। চ্যানেলগুলো এসব গান প্রচার করছে। কিন্তু গাওয়ালেই তো হবে না; ভালো সময় দিয়ে ফোকাস করতে হবে। গাছ লাগালে তাতে পানি দিতে হয়, সার দিতে হয়। পরিচর্যা করলেই তো গাছ ভালো ফল দেবে। পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এ ধরনের গান বাঁচিয়ে রাখা অসম্ভব। আব্বার গানগুলো যদি সংগ্রহ করে রাখতে পারি, তবেই সম্ভব।
কবির বকুল
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জানুয়ারী ১৪, ২০১০
Tags: আব্বাসউদ্দীন, কবির বকুল, ফেরদৌসী রহমান, রথীন্দ্রনাথ রায়
Related News:
Leave a Reply