মেধাস্বত্ব ও কপিরাইট আইন - অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে গানের মানুষ
মেধাস্বত্ব ও কপিরাইট আইন - অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে গানের মানুষ
সংগীতাঙ্গনে এ সময়ের আলোচিত বিষয় ‘মেধাস্বত্ব ও কপিরাইট আইন’। নিজেদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে দেশের গুণী শিল্পী, গীতিকার ও সুরকারেরা এখন ঐক্যবদ্ধ। ‘মেধাস্বত্ব ও কপিরাইট আইন’ বিষয়টি নিয়ে দেশের বিশিষ্ট শিল্পী, গীতিকার, সুরকারদের সঙ্গে গোলটেবিলের আয়োজন করেছিল প্রথম আলো। গোলটেবিলের চুম্বক অংশ নিয়েই এই আয়োজন।
যাঁরা অংশ নিলেন
– রাশেদা কে চৌধুরী
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মহিলা ও শিশু, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা
– মেজর জেনারেল (অব.) মনজুরুল আলম
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন
– এম এ মাহমুদুল হাসান
রেজিস্ট্রার অব কপিরাইট
– মুহম্মদ নূরুল হুদা
সদস্য, কপিরাইট বোর্ড ও পরামর্শক, ডব্লিউআইপিও
– ব্যারিস্টার মোদ্দাসির হোসেন
ড. কামাল হোসেন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের পক্ষে
– রাশেক রহমান
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এসএসএলই
গীতিকার
– গাজী মাজহারুল আনোয়ার
– মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান
– মনিরুজ্জামান মনির
– কাওসার আহমেদ চৌধুরী
সুরকার
– আলম খান
– আলাউদ্দিন আলী
– শেখ সাদী খান
– লাকী আখান্দ্
– মইনুল ইসলাম খান
– প্রিন্স মাহমুদ
কণ্ঠশিল্পী
– সৈয়দ আব্দুল হাদী
– রুনা লায়লা
– রফিকুল আলম
– ফরিদা পারভীন
– আবিদা সুলতানা
– রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা
– এন্ড্রু কিশোর
– আইয়ুব বাচ্চু
– কুমার বিশ্বজিৎ
– ফাহমিদা নবী
– সামিনা চৌধুরী
– শুভ্র দেব
– কনকচাঁপা
– বাপ্পা মজুমদার
– মমতাজ
সমন্বয়কারী
– মতিউর রহমান
সম্পাদক, প্রথম আলো
মতিউর রহমানঃ গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীরা দেশের গর্ব। কিন্তু আমরা শিল্পীদের সম্মানী বা তাঁদের দাবিগুলো পূরণ করতে পারি না। আমি যত দূর জানি, বাংলাদেশ বেতারে একটি গানের জন্য সুরকার ও শিল্পী এককালীন সম্মানী পান। আর শুধু গীতিকার সেই গানের জন্য রয়্যালিটি পান, তবে সেটা খুবই সামান্য। বাংলাদেশ টেলিভিশনেও একই অবস্থা। অন্যদিকে অডিও প্রকাশনা সংস্থাগুলো শিল্পীদের এককালীন নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে অ্যালবাম প্রকাশ করে।
তবে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোতে কোনো রকম অনুমতি, স্বীকৃতি বা সম্মানী ছাড়াই জনপ্রিয় শিল্পীদের হাজার হাজার গান ব্যবহৃত হচ্ছে। অনলাইনে অহরহ গান ডাউনলোড হচ্ছে। যে-কেউ যেকোনো জায়গায় বসে এগুলো ব্যবহার করছে। কিন্তু আইন এ ব্যাপারে কী বলছে, সেদিকে আমাদের খেয়াল দিতে হবে। আমাদের গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীরা তাঁদের পরিশ্রম, সৃষ্টি বা সাফল্যের স্বীকৃতি পান না। এ ব্যাপারে অনেকেই হয়তো সচেতন, অনেকেই নন। সারা বিশ্বে মেধাস্বত্ব আইনের প্রয়োগ আছে। এ দেশে ২০০০ সালে এ আইন হয় এবং ২০০৫-এ তা সংশোধন করা হয়। কিন্তু আইনটির কোনো বাস্তব প্রয়োগ নেই।
কপিরাইট আইন যেন বাস্তবায়িত হয়, সে ব্যাপারে সরকার, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন-বিটিআরসি প্রত্যেকেরই উদ্যোগ নিতে হবে। আইনটি কার্যকর করার জন্য ইতিমধ্যে সরকার একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। এ ব্যাপারে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে একটা চিঠি দেওয়া হয়েছে, বিটিআরসির চেয়ারম্যানকেও দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে আমরা প্রতিবেদনও করেছি। আমি মনে করি, এ ব্যাপারে সরকারের আরও কিছু করার আছে।
কপিরাইট আইন কার্যকর করার জন্য যে কপিরাইট বোর্ড আছে সেখানে যথাযথ লোকবল নেই। প্রতিষ্ঠানটিতে লোকবল দিয়ে একে সক্রিয় ও সফল করে তুলতে হবে, তা না হলে শিল্পীরা তাদের যথাযথ সম্মানী পাবেন না। দেশের প্রখ্যাত গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীরা আজ এখানে উপস্থিত আছেন। এ ছাড়া শিল্পীদের অধিকার সংরক্ষণে সফটওয়্যার সলিউশন্স অ্যান্ড লজিস্টিক এন্টারপ্রাইজ-’এসএসএলই’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। তাদের প্রতিনিধি উপস্থিত আছেন। আশা করি, আলোচনা করে এই পরিস্থিতিতে করণীয়, প্রস্তাব, সমাধান ইত্যাদি ব্যাপারে একটা অবস্থানে আসতে পারব।
শুরুতেই মেধাস্বত্ব নিয়ে কার্যরত কামাল হোসেন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের প্রতিনিধি ব্যারিস্টার মোদ্দাসির হোসেন আইনের বিষয়গুলো বুঝিয়ে বলবেন।
ব্যারিস্টার মোদ্দাসির হোসেনঃ বর্তমান আইনটির আগে ১৯৬২ সালেও এ ধরনের একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। তবে এর প্রয়োগ কখনোই ছিল না। আমার ধারণা, শিল্পীসমাজকে নিজেদের অধিকার সম্বন্ধে সবার আগে সচেতন হতে হবে। তা না হলে বাস্তবায়ন করার পথও আমরা খুঁজে পাব না। ‘কপিরাইট’ শব্দটিতে দুটি শব্দ আছে-কপি ও রাইট। ‘কপি’ অর্থ কোনো একটি আসল জিনিস পুনরায় তৈরি করা, আর ‘রাইট’ মানে অধিকার বা স্বত্ব। আমাদের অনেকেরই হয়তো ধারণা নেই, এই যে গুণী ব্যক্তিরা এসেছেন তাঁদের সৃষ্টির ওপরেও একটা কপিরাইট আছে। অনেকের ভুল ধারণা আছে যে নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) বাধ্যতামূলক। কিন্তু আইন অনুযায়ী, যখনই আমি কিছু সৃষ্টি করেছি তখনই আমার মেধাস্বত্বটা চলে এসেছে। তবে নিবন্ধন আপাতত এটা প্রমাণ করবে যে স্রষ্টা নিজেই ওই সৃষ্টির মেধাস্বত্বের অধিকারী। তবে সচেতনতার বিষয়টি সবচেয়ে আগে।
আমি কিছু সৃষ্টি করে কোনো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানে কিছু টাকার বিনিময়ে গান প্রকাশ করতে দিলাম। এতে যদি কেউ মনে করেন যে, ওই প্রতিষ্ঠানকে কপিরাইট দিয়ে দেওয়া হয়েছে, তবে তা হবে একদমই ভুল। এতে হয়তো একটা নির্দিষ্ট সংখ্যা, ধরুন ১০ হাজার কপির জন্য চুক্তি হয়েছে, ওই পর্যন্তই। আমি জানি না, এই চুক্তিগুলো মৌখিক, না লিখিতভাবে হয়। কিন্তু পেশাদারিত্বের প্রথম শর্ত হিসেবে সবকিছু লিখিত ও পরিষ্কার থাকতে হবে। যত কপির জন্য চুক্তি হচ্ছে তার বাইরে কপি হলে সেটার জন্য আবার নতুন করে চুক্তি করতে হবে। এই চুক্তির বাইরেও আপনি যে-কাউকে মেধাস্বত্ব সংরক্ষণের দায়িত্ব দিতে পারেন, যেন অন্যান্য ক্ষেত্রে আর্থিকভাবে লাভবান হন। এটা গেল নিজেদের সচেতনতা বৃদ্ধির ব্যাপারটা।
এসএসএলই যে কাজটা করছে তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। প্রতিষ্ঠানটি শিল্পী, গীতিকার ও সুরকারদের অনেকেরই মেধাস্বত্ব সংরক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত। যেখানেই আপনার আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকবে, সেখানেই তারা আপনার হয়ে কাজ করবে। এই দায়িত্ব আপনারা তাদের দিয়েছেন। কপিরাইট আইনে কিন্তু বলা আছে, আপনার সৃষ্টি কোথাও ব্যবহার করা হলে অবশ্যই অর্থ দিতে হবে।
মতিউর রহমানঃ এবার বলবেন কপিরাইট বোর্ডের নিবন্ধক এম এ মাহমুদুল হাসান। তারপর বলবেন বোর্ডের সদস্য কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।
এম এ মাহমুদুল হাসানঃ কপিরাইট বোর্ডে ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা। কিন্তু কর্মরত আছেন ১২ জন। প্রকাশনা সংস্থাকে সরাসরি পুরো চুক্তি করা ঠিক হবে না। আর কপিরাইট আইন না মানলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা হবে। এগুলো একটার বাইরে আরেকটা নয়। দুই শাস্তিই একসঙ্গে। তবে এই শাস্তি চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে। অন্যান্য ক্ষেত্রে এক বছর কম এবং এক লাখ টাকা কম। আদালতে যেতে হলে অবশ্যই আপনার গান নিবন্ধন করে রাখতে হবে, যেন আইনের চোখে স্বীকৃতি দেওয়া যায়।
আইয়ুব বাচ্চুঃ কোনো প্রতিষ্ঠান আমার ক্যাসেট প্রকাশ করেছে। এখন চুক্তিতে যদি এক হাজার বা ১০ হাজার প্রকাশ করার কথা বলা থাকে আর সে যদি এর বাইরে আরও কপি বিক্রি করে, তাহলে তা আমি কীভাবে জানব?
মুহম্মদ নূরুল হুদাঃ আমার সৃষ্টিকে নকল করার অধিকার শুধু আমার। আর যাকে আমি এই দায়িত্ব দেব, তার। একটি বিষয় আইনে নেই; চুক্তিতে ১০ হাজার প্রকাশ করার কথা বলে এর বেশি করা হলে কী ব্যবস্থা। আইনের বাংলা অনুবাদ ঠিক হয়নি। কপিরাইট আইনটি আমরা বাস্তবায়ন করতে পারছি না, কারণ এর অফিসে শুধু নিবন্ধক আছেন, আর কেউ নেই। শিল্পীদের অধিকার রক্ষায় এক থাকতে হবে। শিল্পীদের কপিরাইট সোসাইটি গঠন করতে হবে। সোসাইটিতে তাঁদের সৃষ্টি রক্ষা করতে তাঁরা নিজেরাই তালিকা করবেন। তারপর তা যাবে বোর্ডের কাছে। আইনের ২৭ ধারায় বলা আছে, শিল্পী চাইলে তাঁর গান বা সব সৃষ্টি সবার জন্য উ্নুক্ত করতে পারেন। নির্দিষ্ট ফরমে এই ঘোষণা দিতে হবে। আর একটা হলো, যত কিছুই করি না কেন, ‘ইউজার এগ্রিমেন্ট’ অবশ্যই থাকতে হবে। শুধু গীতিকার, সুরকার, শিল্পীই নন, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের জন্যও এটা সমানভাবে জরুরি।
গাজী মাজহারুল আনোয়ারঃ একবার এক প্রযোজককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনারা কিসের ভিত্তিতে গান রিমেক করছেন। জবাবে উনি বলেছিলেন, আপনারাই তো আপনাদের অধিকার নষ্ট করছেন। শিল্পীরা যখন গান করেন তখন গীতিকার ও সুরকারের নাম বলেন না। সেখানেই প্রথম আপনাদের অধিকার খর্বিত হয়। মিডিয়াতে আজকাল বিভিন্নভাবে অনেক গান প্রচারিত হচ্ছে। কিন্তু গীতিকার-সুরকারের নামও নেওয়া হয় না। মেধাস্বত্ব নিয়ে এই যে উদ্যোগ, তা ভালো। জানি সুদূরপ্রসারী, কাঠখড় পোড়াতে হবে। প্রাপ্তি কী হবে, জানি না। তবে এটুকুই শান্তি, এ সন্তানটা যে আমার, সে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। ব্যক্তিগত জীবনে আমি শুধু গীতিকারই নই, পাশাপাশি চলচ্চিত্রকার; প্রযোজকও। আমার দুটি ছবি নকল (পাইরেসি) করে কেউ কেউ ২০-২৫ লাখ টাকাও আয় করে নিচ্ছে। তার জন্য আদালতে লাখ টাকা খরচ করা ব্যাপার না। কিন্তু কপিরাইট অফিস থেকেও সেভাবে সহযোগিতা পাই না। যা-ই হোক, শুরু তো হতে হবে। আমি এই শুরুকে স্বাগত জানাই।
আলম খানঃ আজকাল ছায়াছবির গান নিয়ে যে অনুষ্ঠানগুলো হয়, সেখানে ছবি ও পরিচালকের নাম থাকে। কিন্তু গানের আসল যে তিনজন, তাঁদের কোনো নাম নেই। বহুবার ফোন করা হয়েছে, উত্তর এসেছে, ‘দেখি।’ কিন্তু ওই দেখা পর্যন্তই। যেটা শুরু হচ্ছে সেটা খুবই ভালো। কিন্তু বিগত দিনে আমাদের গান ব্যবহার করে কোম্পানিগুলো যে হাজার হাজার টাকা আয় করেছে তার কী হবে? সারেং বৌ ছবির আমার সুর করা ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানটি আমার জানা মতে, এক কোটি বার মোবাইল ফোনে ডাউনলোড হয়েছে। ৩০ টাকা করে হলে ৩০ কোটি টাকা। এই চার্জ প্রতিমাসেই নিচ্ছে। সে হিসাবে বছরে ৩৬০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে গত কয়েক বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। আমি যদি এর ১৫ শতাংশই পাই তবে কী হতো? আমি কেন এটা থেকে বঞ্চিত হব? আর আমি আমার অংশ পেলে যে আয়কর দিতাম, সরকার তো তা-ও হারাচ্ছে। আমি কি চিরদিনই বঞ্চিত থাকব? সরকারের প্রতি আমার আবেদন, আমার এই বকেয়া টাকা আদায় করে দিন।
রুনা লায়লাঃ সবাই আজ একসঙ্গে হয়েছি দেখেই খুব ভালো লাগছে। আলম খানের মতো আমিও বলি, রেডিও-টিভিসহ যেসব জায়গায় আমাদের গান ব্যবহৃত হবে, সেসব জায়গা থেকে আমাদের প্রাপ্য টাকা সরকারকে এনে দিতে হবে। এটা অনুরোধ নয়, দাবি। আরেকটা ব্যাপার হলো, গানের রিমেক বা রিমিক্স করা হচ্ছে অনুমতি না নিয়েই। এ ব্যাপারে আমাদের শিল্পীদের সচেতন হওয়া উচিত। অন্য কারও গান গাইবার আগে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে, ওই গানের জন্য অনুমতি নেওয়া আছে কি না। কেননা অনুমতি না নিয়ে আমার গান গাওয়ার কারণে আমি যদি অভিযোগ করি, তবে সেই শিল্পীও বিপদে পড়তে পারেন। সুতরাং নিজ দায়িত্বে দেখে নিতে হবে গান গাওয়ার অনুমতি আছে কি না। আরেকটা ব্যাপার হলো, চলচ্চিত্রের গান। আমরা কিন্তু ছবিতে গাইবার জন্য শুধু একবার টাকা পাচ্ছি। তারপর নানাভাবে এই গান অডিও-ভিডিও-টিভি-রেডিওতে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রযোজকদের বলতে চাই, সিনেমার বাইরে কোথাও গানটি ব্যবহার করতে হলে শিল্পী, গীতিকার ও সুরকার-তিনজনেরই অনুমতি নিতে হবে।
গাজী মাজহারুল আনোয়ারঃ ছবির প্রসারের জন্য যদি ছবির গানগুলো সিডি বা অন্য কোথাও ব্যবহার করি, তাতেও কি অনুমতি লাগবে?
নূরুল হুদাঃ এ ব্যাপারে ‘ইউজার এগ্রিমেন্ট’-এ লেখা থাকতে হবে, ওই গান কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবে। তার বাইরে কোনো কিছু করতে গেলে অবশ্যই অনুমতি লাগবে।
রুনা লায়লাঃ আরেকটা ব্যবহার হলো, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার একটা অনুষ্ঠান বারবার প্রচারিত হলেও তার টাকা কিন্তু ওই একবারই দেওয়া হয়। এটারও প্রতিকার হওয়া উচিত। প্রতিবার প্রচারের জন্য নির্দিষ্ট একটা টাকা অংশগ্রহণকারীদের দিতে হবে।
মোহাম্মদ রফিকুজ্জামানঃ রেডিও-টিভিতে যে চুক্তি হয়, তা খুবই অপমানজনক। শিল্পী ও সুরকারকে যে টাকা দেওয়া হয়, তা অভাবনীয়। তবে ওই একবারই। কোনো দিন আর কিছু দেওয়া হয় না। গীতিকার তো প্রথমে কিছুই পান না, এরপর প্রতিবার প্রচারিত হলে বর্তমানে ১০ টাকা করে পান। আর সুরকার যদি সেই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, তাহলে তিনি কখনোই কিছু পান না। রেডিও-টিভির এই চুক্তিপত্রগুলো পরিবর্তন করতে হবে।
সৈয়দ আব্দুল হাদীঃ কপিরাইট নিয়ে আমি কিছু কাজ করেছি। শিল্পীদের দায়িত্বটাই বড়। এতে পরিষ্কার করে বলা আছে, বাংলাদেশে কপিরাইট একটি হস্তান্তরযোগ্য বিষয়। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লিখিত চুক্তি থাকতে হবে, তা না হলে আপনি কোথাও দাঁড়াতে পারবেন না। এই চুক্তির শর্তগুলো অন্যান্য সম্পদের হস্তান্তরের চুক্তির মতো হবে। তবে তা বিদ্যমান কপিরাইট আইনের কাঠামোর মধ্যে হতে হবে। প্রকাশনার সংখ্যা কত, তা চুক্তিতে উল্লেখ থাকতে হবে। তা কোথায় কোথায় ব্যবহার করা হবে, তা-ও উল্লেখ থাকতে হবে। ভৌগোলিক সীমানা, কী পরিমাণ রয়্যালটি দেওয়া হবে, ইত্যাদি অনেক ব্যাপার আছে। এর মধ্যে সময়সীমার ব্যাপারও আছে। এই শর্তগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকা বাঞ্ছনীয়। লাইসেন্সের মাধ্যমেও কপিরাইট হস্তান্তর করা যায়, আমি আমার যাবতীয় সম্পদ অমুককে দিয়ে দিলাম। আমরা কি কখনো খতিয়ে দেখেছি, যে চুক্তিতে আমি সই করলাম তাতে কী লেখা আছে? কোনোদিন দেখিনি। আমরা সিনেমাতে গান গাওয়ার সময় প্রযোজকের কাছে কোনো চুক্তি চাইনি, তাঁরাও কখনো দেননি। এখন যদি তাঁরা আমার গান যত্রতত্র ব্যবহার করেন, আর আমরা যদি বিষয়টি নিয়ে আদালতে যেতে চাই, তাহলে কোন ভিত্তিতে আমরা দাঁড়াব? আপনার লিখিত কোনো কিছু কি আছে? সে যেমন চাচ্ছে করছে, আপনি যেমন চাচ্ছেন করছেন। অডিওর ক্ষেত্রে আমরা কি চুক্তি পড়ে দেখি? সেখানে কোথাও কী বলা আছে, এক হাজার বা ১০ হাজারের বেশি কপি করা যাবে না। না, এমন কোনো সীমা নেই। তাহলে আমরা কী করে তাকে ধরব? সত্যিকার অর্থে, এটা আমাদের অডিও গানের ক্ষেত্রে একটা বিরাট সমস্যা। এর সমাধান আমাদেরই করতে হবে। হুদা সাহেব একটা কবিতার বই বের করলেন, এটা শুধু তাঁর নিজস্ব সম্পদ। কিন্তু আমরা একটা গান গাইলাম, সেটা আমাদের নিজস্ব সম্পদ নয়। এতে তিনটা পার্টি জড়িত থাকে। সুতরাং আমাদের সব সমস্যার সমাধান করতে হবে।
রুনা লায়লাঃ আমি একটা কথা বলতে চাই, হাদী ভাই। আমি ১৯৭৭-এ প্রথম আমেরিকাতে যাই অনুষ্ঠান করতে। ওখানে আমাকে জোয়ান বায়েজের একটা ইংরেজি গান গাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল। আমি তাঁর কাছে অনুমতি নিয়েছিলাম যে আপনার একটা গান আমি গাইতে চাই। উনি অনুমতি দেওয়ার পর আমি সেই গানটি গেয়েছিলাম। আমাদের দেশে এই জিনিসটা নেই।
মতিউর রহমানঃ এই আলোচনা চলতে থাকবে। সব দাবি আদায় সহজ ও দ্রুত হয়ে যাবে, তা না। আলোচনা হলে কিছু অগ্রগতি হবে। এইভাবে আমাদের সামনে এগুতে হবে। মানুষ আস্তে আস্তে সচেতন হবে। আমরাও উদ্যোগী হব। শিল্পীরা চুক্তি করেন না, তাঁদের তা করতে হবে। আবার চুক্তি যে শুধু সিনেমার জন্য হবে, তাও নয়। অডিওর জন্য আলাদা, ভিডিওর জন্য আলাদা-সবকিছুর জন্য করতে হবে। এখন কথা বলবেন রাশেক রহমান।
রাশেক রহমানঃ ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানের প্রণেতা গীতিকার বা সুরকারের মধ্যে যেকোনো একজনও যদি বলেন যে এ গানটি প্রচার করা যাবে না, তাহলে ওই গান আর চালানো যাবে না। এটা কপিরাইটে খুবই পরিষ্কার আছে। অনুমতি ছাড়া ওমুক গান ব্যবহার করা হয়েছে-প্রণেতাদের মধ্যে যেকোনো একজন আইনগতভাবে অভিযোগ করতে পারেন।
মতিউর রহমানঃ এবার কুমার বিশ্বজিৎ ও সামিনা চৌধুরী বলবেন।
কুমার বিশ্বজিৎঃ আসলে এখানে সবাই একই পরিবারের লোক। আমাদের কোনো শিল্পী সংস্থা নেই। আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য একটা সংগঠন করা দরকার, এটা আমি মনে করি। বাকি আদায় কীভাবে হবে, সেটা কোনো বিষয় না। আমরা যদি সংগঠিত হতে পারি, তবে আদায় করতে বেশি সময় লাগবে বলে আমি মনে করি না।
সামিনা চৌধুরীঃ রেডিওতে রয়্যালটি নিয়ম করা হয়েছিল আব্বাদের (মাহমুদুন নবী) সময়, অনেক ছোটবেলায় শুনেছিলাম। কিন্তু অত শিল্পীর অত গানের রয়্যালটির ব্যবস্থা করা সরকারিভাবে সম্ভব হয়নি বলে তা আবার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমরা যদি এমন করে ভাবতে পারি যে শিল্পীরাও পেল, অডিও কোম্পানিও পেল, কারও কষ্ট হলো না, তবে ভালো হয়। আরেকটি জিনিস আমি জানতে চাই, একটি গানের কপিরাইট ১৫-২০ বছর পর হতে পারে কি? যেমন, ২০-২৫ বছর আগে ছোটবেলায় যে গানগুলো গেয়েছিলাম সেগুলো আবার করতে চাই। আমরা কি আবার সেই গানগুলো রেকর্ড করে কোনো কোম্পানি থেকে বের করতে পারব? আমরা বিষয়টাকে জটিল না করে সহজ করে করতে চাই। কারণ আমরা সবাই সবাইকে ভালোবাসি। এটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার।
ব্যারিস্টার মোদ্দাসির হোসেনঃ আপনি নিশ্চয়ই পারবেন। আপনার কপিরাইটের নির্দিষ্ট চুক্তি কতটুকু সেই অনুযায়ী আপনি তা করতে পারবেন। আপনার মৃত্যুর ৬০ বছর পর পর্যন্ত আপনার কপিরাইটের স্বত্ব থাকবে। যেমন আপনি ২০১০ সালে মারা গেলে আপনার কপিরাইটের স্বত্ব থাকবে ২০৭০ সাল পর্যন্ত।
সামিনা চৌধুরীঃ আমি বলতে চাচ্ছিলাম যে আমার একটা গান একটা কোম্পানিকে দিয়েছি; ১৫-২০ বছর পর যদি কেউ এটা নতুন করে গাইতে চায়, তবে কি আমার কোনো দোষ হবে? কোনো অসুবিধা হবে?
ব্যারিস্টার মোদ্দাসির হোসেনঃ কোম্পানি বের করতে পারবে, যদি আপনার এবং সবার সম্মতি থাকে তাহলে।
রফিকুল আলমঃ কপিরাইটের ব্যাপারটা আমরা আমাদের ক্যারিয়ার শুরুর সময় থেকেই জানি। ইতিহাস ঘাঁটলেই এটা পাওয়া যাবে। শাজাহান নাটক নিয়ে তিন বছর মামলা চলেছিল। এটা পুরোনো বিষয়। কিছুদিন আগে একটা সেমিনারে গিয়েছিলাম। এই কথাগুলোই বারবার ফিরে আসছে। কপিরাইটের যে ব্যাপারগুলো আপনারা বললেন, আমার মনে হয়, এই ব্যাপারগুলো আরও ভালোভাবে আমাদের কাছে আসা দরকার।
এন্ড্রু কিশোরঃ রয়্যালটির জন্য আগেও আন্দোলন হয়েছে। ১৫-২০ বছর আগে রাজশাহী বেতারে আন্দোলনের মাধ্যমেই রয়্যালটি পেয়েছি আমরা। কিন্তু পরে সেই আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা পরামর্শক হিসেবে কাজ করতে পারে।
খুরশীদ আলমঃ এসব করে কিছু হবে না। আগেও অনেক আন্দোলন হয়েছে। শিল্পীরা কখনো এক হতে পারেনি। এভাবেই চলতে থাকবে।
শুভ্র দেবঃ ইউজার কনট্রাক্ট থাকা জরুরি। তা হলে দেনদরবার করা যায়। শিল্পীদের একটা প্লাটফর্ম তৈরি করতে হবে। প্রকাশনা সংস্থাগুলো যতগুলো সিডি বা ক্যাসেট প্রকাশ করে তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি নকল (পাইরেসি) হয়।
মমতাজঃ ওয়ারিদের একটি বিজ্ঞাপনচিত্রে আমার একটা গান বাজে। সেটা আমাদের অনুমতি ছাড়া। এটা কি তারা পারে?
মোহাম্মদ রফিকুজ্জামানঃ আমরা হতাশ হতে চাই না। না পাওয়ার মধ্যে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমার জীবনে হয়তো এর সফলতা দেখব না। পরবর্তী প্রজ্ন তো পাবে। এ জন্য আমাদের সবাইকে এই ইতিবাচক পথে এগিয়ে আসতে হবে। অনেক বার না হওয়ার পরেও একবার হতে পারে।
ফরিদা পারভীনঃ একটি কোম্পানি আমার গাওয়া ১২টি গান এক রকম কথা বলে অন্য একটা কোম্পানিকে দিয়ে দিল, আমার অনুমতি ছাড়াই। এখানে প্রকাশনা সংস্থার মালিকেরা থাকলে ভালো হতো। তাঁদের বক্তব্য শুনতে পারতাম।
আইয়ুব বাচ্চুঃ এই চর্চাটা শুরু হয়ে যাক। আজ অসুস্থ আবদুর রহমান বয়াতির জন্য চ্যারিটি কনসার্টের আয়োজন করতে হয়। এটা দুনিয়ার আর কোথাও হয় না। তাঁকে যথাযথভাবে সম্মানিত করতে পারিনি বলে আজ এই অবস্থা। বিগত দিনে যতগুলো মোবাইল রিংটোন ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলোর টাকা দিয়ে নতুন চুক্তি হতে হবে। আমরা সরকারকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ট্যাক্স দিতে চাই। আমরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করি। চুরিচামারি করি না। এটা আমাদের মেধা ও শারীরিক পরিশ্রম। যাঁরা গান লেখেন, তাঁদের অজস্র খাটুনি যায়। শারীরিকের চেয়ে মাথার খাটুনি অনেক বেশি। আমরা এমন এক পেশা বেছে নিয়েছি, যেখানে কোনো ঘুষ নেই। যদি সে ব্যবস্থা থাকত, তাহলে খুশি হতাম, আজকের এ মিটিংয়ে আসতাম না। কিন্তু দুঃসংবাদ, আমাদের যা প্রাপ্য তা-ই দেওয়া হয় না। আমাকে ১০ টাকার কথা বলে তিন টাকাও দেওয়া হয়েছে। তিন টাকা দিয়ে একটা ক্যাসেট করিয়ে চৌদ্দ রকমের চৌদ্দ নামে ক্যাসেট বের করেছে কোম্পানিগুলো। আমরা প্রতিবাদ করতে পারিনি, কারণ আমরা নিরীহ। আমরা যেহেতু গানবাজনা নিয়ে আছি, সরকারের কাছে তাই আমাদের দাবি, আমাদের প্রতি একটু দৃষ্টি দেওয়া হোক।
মতিউর রহমানঃ এফএম রেডিওগুলো সারা দিনই বিভিন্ন শিল্পীর গান বাজায়। কিন্তু সেসব ক্ষেত্রে গীতিকার, সুরকার, শিল্পীদের কারও নাম পর্যন্ত নেয় না।
কনকচাঁপাঃ মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের শিল্পীরা দেশের জন্য অনেক কিছু করেছেন। তাঁরা গান গেয়েছেন। এখনো আমরা সরকারে জন্য যেকোনো ক্ষেত্রেই গান গাই। বিদেশি অতিথিরা এলে আমাদের ডাক পড়ে। এখন কপিরাইটের ক্ষেত্রে সরকার শিল্পীদের জন্য কিছুটা হলেও যদি করে, তাহলে আমাদের শেষ বয়সে অনাহারে মরতে হয় না। প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদা আলাদাভাবে চুক্তি করা কঠিন। সরকার যদি শিল্পীদের জন্য পেনশনের ব্যবস্থা করে, তাহলে খুব ভালো হয়। শেষ বয়সে ছেলেমেয়ের কাছে হাত পাততে চাই না। আমি হয়তো সচ্ছলভাবে চলতে পারি, কিন্তু আমার মতো অনেক শিল্পী আছেন, যাঁরা পায়ে জুতাও পরতে পারেন না।
আবিদা সুলতানাঃ অনেকবার এ নিয়ে প্রস্তাব হয়েছে, অনেক আলোচনা হয়েছে, অনেক রকম আন্দোলনও হয়েছে। কিন্তু আমরা পারিনি। এখন যেটা শুরু করতে যাচ্ছি, তার পক্ষে আছি এবং অবশ্যই থাকব। আমরা হাজার হাজার গান করেছি। বিদেশে একজন শিল্পী একটা অ্যালবাম বের করলে তাঁকে আর সারা জীবন চিন্তা করতে হয় না। অথচ আমরা হাজার হাজার গান করেও ভাবছি যে ভবিষ্যতে আমাদের দুস্থ শিল্পী হয়ে মরতে হবে। এটা খুব লজ্জার কথা, দুঃখের কথা।
প্রিন্স মাহমুদঃ আমাদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। আর আমরা যদি এগুলো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাই, তাহলে আমরা কাজ করব কখন? বাচ্চু ভাইয়ের ‘বার মাস’ গানটা আমি করেছি। এক কোটি টাকা ব্যবসা করেছে গানটা। আমরা কত টাকা পেয়েছি? আমি ‘মা’, ‘বাবা’, এই গানগুলো লিখেছি ও সুর করেছি। এই এক-একটি গান এক কোটি, দেড় কোটি, দুই কোটি টাকার ব্যবসা করেছে। ‘গুরু ঘর বানাইলা কী দিয়া’-এই গানটি দিয়েও অনেক টাকার ব্যবসা করেছে। আমাদের শিল্পীদের পক্ষে আসলে সম্ভব না সবকিছু দেখে দেখে কাজ করা। এটা আমরা পারব না। কেউ এগিয়ে এলে আমাদের উচিত তাঁদের সহযোগিতা করা।
মনিরুজ্জামান মনিরঃ বিভিন্ন রকমের চুক্তি আছে রেডিও ও টেলিভিশনের সঙ্গে। এখানে কায়দা-কানুন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। রেডিও ও টেলিভিশনের সঙ্গে আমাদের সামগ্রিকভাবে চুক্তি আছে; সেটা শুধু গান প্রচারের জন্য। যাঁরা দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে এসেছেন তাঁদের ধন্যবাদ জানাই। তাদের কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে গেলে আমি বাংলাদেশ গীতিকবি সংসদের পক্ষ থেকে এবং ব্যক্তিগতভাবে তাঁদেরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।
লাকী আখান্দ্ঃ আমাদের মূল সমস্যা, আমরা গান-সুর নিয়ে ব্যস্ত থাকি। আমরা এসব করব কখন? এটা তো আমাদের কাজ না। এমন একটা প্রতিষ্ঠান হোক, যাঁরা এই সমস্ত কাজ করবেন এবং উদ্যোগ নিয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এগুলোর বাস্তবায়ন করবেন। তাহলে সবচেয়ে ভালো হবে। তবে এই মুহূর্ত থেকে যদি প্রথম আলো উদ্যোগ নেয় যে আমাদের কপিরাইটের বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করবে, তাহলে সবচেয়ে ভালো হবে।
রুনা লায়লাঃ আমি একটা কথা বলতে চাই। আমাদের সবাইকে একসঙ্গে মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। একজন এদিকে অন্যজন আরেকদিকে গেলে কিছু হবে না। আমাদের সবাইকে একত্রে এইভাবে এগিয়ে যেতে হবে।
আইয়ুব বাচ্চুঃ এর আগেও আমরা কয়েকবার একত্র হয়েছি। বারবার ব্যর্থ হয়েছি।
রুনা লায়লাঃ না, এবার আমাদের করতেই হবে।
আইয়ুব বাচ্চুঃ সেটা কীভাবে? আমার এখনো সন্দেহ আছে, আমরা আসলেও আমাদের প্রয়োজন বুঝেছি কি না। এখনো আমাদের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে যে আমরা পরস্পরের ভাই। বেশ কয়েকবার সংগঠন হয়েছে অনেক কিছুর জন্য। এই উদ্যোগের শুরু থেকে আমরা ছিলাম চার-পাঁচজন। আমি অনেক আনন্দিত যে আমাদের সঙ্গে এখন আরও অনেকে রয়েছেন।
ফাহমিদা নবীঃ আমি ইতিবাচক উদ্যোগের সঙ্গে সব সময় আছি। আমার একটা কথা জানতে ইচ্ছে হচ্ছে যে আমার বাবার গানগুলোর কপিরাইট কার?
রাশেক রহমানঃ আপনার বাবার কপিরাইট আপনারা দুই বোন ও আপনার ভাই, তিনজনের ওপর ন্যস্ত। আপনার আম্মা যদি জীবিত থাকেন, তবে তাঁর ওপরও ন্যস্ত থাকবে। আইনে এটা আছে।
ফাহমিদা নবীঃ আমার মা বেঁচে আছেন, আমরা বেঁচে আছি। আমরা শুধু এতটুকু চাই যে আমাদের সেই সম্মানটুকু দেওয়া হোক।
রাশেক রহমানঃ কোনো গানকে প্রমোট করার জন্য যদি ওই গান একটি নির্দিষ্ট সময় দেখানো হয়, সে ক্ষেত্রে রয়্যালটি দাবি করার নিয়ম নেই। কিন্তু যদি কোনো গানের স্বল্পতম অংশও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় বা তাকে অর্থনৈতিকভাবে মুনাফা দেয়, তবে সে ক্ষেত্রে তিনি অবশ্যই আপনাকে রয়্যালটি দিতে বাধ্য।
রফিকুল আলমঃ আমার স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি আমার সন্তান উত্তরাধিকার সূত্রে পেল। সে তা ইচ্ছে করলে বিক্রি করে ফেলল বা বাড়ি থাকলে ভেঙে ফেলল, নতুন করে বাড়ি করল বা যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে। আমার লেখা একটি গান কি তার যেমন ইচ্ছা পরিবর্তন করার অধিকার থাকবে?
রাশেক রহমানঃ না, উনি পরিবর্তন না করে অ্যাসাইন করতে পারবেন। পরিবর্তন করার অধিকার থাকবে না।
রফিকুল আলমঃ আমি এটা বলছি এই জন্য যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা সুকুমার রায়ের একটি শিশুতোষ কবিতাকে দুই লাইন ব্যবহার করে তারপর সেটাতে যা ইচ্ছা তা-ই জুড়ে দিয়ে সুকুমারকে তো অপমান করা হয়েছেই, বাচ্চারা যারা এই কবিতাটির প্রতি আগ্রহী, তাদেরও বিপথগামী করা হয়েছে।
মোদ্দাসির হোসেনঃ আমার কপিরাইটের ব্যাপারে আমাকেই সচেতন হতে হবে।
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাঃ শিল্পীরা এখানে তাঁদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছেন। রবীন্দ্রসংগীতের শিল্পীদেরও একই সমস্যা। এখানে হয়তো গীতিকার, সুরকারের ব্যাপারটা নেই, কিন্তু যাঁরা শিল্পীদের ব্যবহারের সুযোগ নিচ্ছেন, তাঁরা এগুলোর অপব্যবহার করছেন। আবার নজরুলের গানেও এমন হচ্ছে। তবে আমি মনে করি যে সব ধরনের গানের ক্ষেত্রেই এটা করা উচিত। আধুনিক গানের ক্ষেত্রে সুরকার, গীতিকারেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, কিন্তু রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে শিল্পীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন একইভাবে। আপনাদের এই সংগঠনের মধ্যে রবীন্দ্রসংগীতসহ দেশের সব শিল্পীর সম্পৃক্ততা দরকার। এর জন্য একটি কমিটি গঠন করে সত্যিকার অর্থে যদি কাজটা এগিয়ে চলে, তবেই সার্থকতা আসবে।
শেখ সাদী খানঃ জীবনে অনেক কিছু হারিয়েছি। বাকিটা হারাতে হলে হারাব। তবে আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য এসএসএলইকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া উচিত। যেহেতু তাঁরা আমাদের পক্ষ হয়ে কাজ করছে, আমি আশা করব, টেলিকমের ব্যাপারগুলো এখান থেকেই প্রথম শুরু হবে। যেহেতু আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করতে চাই। আমার মনে হয়, সবাই একসঙ্গে কাজ করলে ক্ষতিটাও মেনে নিতে পারব।
মইনুল ইসলাম খানঃ ধন্যবাদ এই গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করার জন্য। এখানে আমার অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ, সহকর্মী এবং সরকারি কর্মকর্তাও রয়েছেন। আমাদের অধিকার বাস্তবায়ন কি যে যার মতো করবে? এটা সমষ্টিগতভাবে যদি করা হয় তা আরও বেশি জোরদার হবে। আমরা এসএসিএলইকে সহযোগিতা করতে চাই।
কাওসার আহমেদ চৌধুরীঃ আজকের কপিরাইটের এ ইস্যুটি হয়তো একদিন ইতিহাসে লেখা হবে। দ্বিতীয় কথা, অধিকারটা হঠাৎ বুঝতে পেরে আমরা খেপে উঠেছি। এতদিন তো এটা জানতামই না। আরও অনেক আলোচনার দরকার। আলোচনা করতে করতেই আমরা এক জায়গায় গিয়ে পৌঁছব। একটা ফোরামের দরকার। ফোরাম ছাড়া বাংলাদেশও সৃষ্টি হতো না।
মাহমুদুল হাসানঃ রিংটোন নিয়ে আমরা বিআরটিসির এবং সব মোবাইল ফোন কোম্পানিকে পত্র দিয়েছি। এ ব্যাপারে আইনকানুন দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। তারা এটা পারে না, কারণ যিনি প্রণেতা তাঁর সঙ্গে চুক্তি ছাড়া পারবে না। শাস্তি তাদের পেতে হবে। তারপর টাস্কফোর্স; টাস্কফোর্স জাতীয় স্তরে করা হয়েছে। জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক হবেন টাস্কফোর্সের সভাপতি। পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট হবেন সদস্যসচিব। জাতীয় পর্যায়ে তা এখন উপসচিব পর্যায়ে আছে। কিন্তু যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে তা করা হবে। চুক্তিপত্র এলেই আপনারা সই করেন, কিন্তু দেখার সময় থাকে না। কিন্তু যিনি চুক্তিপত্র করছেন তিনি দক্ষ। দেখেশুনে তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাই আপনিও সময় নেবেন এবং অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে যাচাই করে সই করবেন। না হলে আদালতে আপনি ঠকে যাবেন। আপনি আপনার সম্মানীটা পাবেন না। ইদানীং মোবাইল ফোন নিয়ে আড়াই ঘণ্টার একটা ছবি ভিডিও করা যায়। এবং তা বাইরে গিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে। আর কপিরাইট অফিস কিন্তু সরকারের আর দশটা অফিসের মতো অফিস না। এটা একটা আদালত, যদিও অফিস নামে পরিচিত। কপিরাইটের নিবন্ধক এর বিচারক। রেজিস্ট্রারের পরে বোর্ড। বোর্ডের পরে হাইকোর্ট। কাজেই এটা অত্যন্ত শক্তিশালী আদালত এবং তা অন্য আদালত থেকে নথি তলব করতে পারে। আপনারা অতীতের ক্ষতিপূরণ পেতে চাচ্ছেন। হ্যাঁ, মামলা করলে আপনারা উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পাবেন এবং সেটা কোর্ট নির্ধারণ করবে, কত ক্ষতিপূরণ হয়েছে। সে রকম একটি বিধান আছে। যিনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, মামলাটা তিনি করবেন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বাদী হয়ে বা তার পক্ষে একজন মামলা করেন। কিন্তু মামলা না করলে আপনার ক্ষতিপূরণের প্রশ্নই আসে না।
আইয়ুব বাচ্চুঃ ধরুন, আমি একটা বা দুটো অ্যালবামের ব্যাপারে অবচেতনভাবে কোনো ভুল করে চুক্তি করলাম। এখন কি ওই গান ওনার হয়ে গেল, না আমার থাকল?
নূরুল হুদাঃ গান সব সময় আপনার। যদি আপনাকে চুক্তিতে ইচ্ছা করে কোনো ভুল করিয়ে নেয়, তাহলে এর বিরুদ্ধে আপনি অভিযোগ করতে পারেন।
আইয়ুব বাচ্চুঃ আমার কাছে বিভিন্ন মোবাইল ফোন কোম্পানির কনটেন্টররা গান নেওয়ার জন্য ফোন করে। ওরা বিভিন্ন কোম্পানির কাছে থেকে আমার গান নিয়ে যায়। আমি যদি জিজ্ঞেস করি, এ গান তোমরা কী করে আপলোড করলে? তারা বলে, কোম্পানি বিক্রি করেছে। এখন এটার কী ব্যবস্থা হবে?
নূরুল হুদাঃ এ ব্যাপারেই আমি কথা বলতে চাচ্ছিলাম। দুজন বা তিনজন মিলেও যদি একটা কপিরাইট সোসাইটি করা হয়, তাতে যারা নিবন্ধিত হয়েছে তাদের কাজও করবে, যারা নিবন্ধিত হয়নি তাদের কাজও করবে। আপনার গান কোথায় গাওয়া হচ্ছে, কী করা হচ্ছে-এ বিষয়ে আপনি জানেন না। কপিরাইট সোসাইটির দায়িত্ব হবে, বিভিন্ন জায়গায় তা পর্যবেক্ষণ করা।
আলাউদ্দিন আলীঃ যেই রিমিক্স গানগুলো হলো, এ দিয়ে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করা হচ্ছে। ব্যবস্থাপকেরাই গীতিকার-সুরকার হয়ে বিভিন্ন কোম্পানির কাজ করছে। ওই গানগুলোর রয়্যালটি কীভাবে দেবেন আপনারা?
রাশেক রহমানঃ ধরুন, ‘ওরে নীল দরিয়া’র সুরকার কেউ নতুন করে হতে পারবে না। সেটা অবৈধভাবেই করছে, এটা তো পরিষ্কার।
আলাউদ্দিন আলীঃ যে টাকা আয় করছে, তা কি গীতিকার-সুরকার পাবেন না?
রাশেক রহমানঃ সেটা আপনি ক্রিমিনাল কিংবা সিভিল আইন, উভয়ভাবেই চাইতে পারেন।
মতিউর রহমানঃ এখানে এসএলএলইর কথা আসছে। কপিরাইট সোসাইটির কাজটা কি এসএলএলই করতে পারে, নাকি কপিরাইট সোসাইটির কয়েকজন মিলে করতে পারে?
নূরুল হুদাঃ কপিরাইট সোসাইটি নিবন্ধন করতে চাইলে কোম্পানির অ্যাক্টে তা করতে হবে। সোসাইটি নিবন্ধন করার পর তারা আইনগত সহায়তা যে-কারও কাছ থেকে চাইতে পারে। আপনার পক্ষ থেকে সোসাইটি লিগ্যাল এইডের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইবে। আর যদি কোনো কোম্পানির মাধ্যমে শিল্পী যেতে না চান, তাহলে তিনি সরাসরি লিগ্যাল এইডের কাছে যেতে পারবেন।
মতিউর রহমানঃ নূরুল হুদার কথা থেকে যেটা বুঝলাম, একটা কপিরাইট সোসাইটি হওয়া দরকার। এ ক্ষেত্রে গীতিকার, সুরকার, শিল্পী, চার-পাঁচজন নিয়ে একটা কপিরাইট সোসাইটি করার মতো পরিবেশ কি আছে?
নূরুল হুদাঃ তারা যদি সোসাইটি হিসেবে কাজ করতে চায়, তাহলে তাদের ওই ছাতাটা (আমব্রেলা) তৈরি করতে হবে। তার ছাতার ভেতর সব শিল্পী নিবন্ধিত হবে। এটাই স্বাভাবিক এবং সব শিল্পী তাঁর কর্মের যে বিবরণ-আমাদের একটা ফরম আছে-সেখানে নিবন্ধন করতে পারবে।
আলাউদ্দিন আলীঃ আমি বেঁচে থাকা অবস্থায় যদি এটা বাস্তবায়িত হয় এবং কিছু টাকা পাই, তাহলে শেষ বয়সে হয়তো চিকিৎসায় কাজে লাগবে।
রুনা লায়লাঃ আমাদের অনেক শিল্পী আছেন যাঁরা স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু ওই পুরস্কার পর্যন্তই ব্যাপারটা সীমাবদ্ধ। রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো সরকারই আমাদের ভিআইপি বা সিআইপি ধরনের কোনো মর্যাদা (স্ট্যাটাস) দেয়নি। আমরা সাধারণ শিল্পী হিসেবেই থাকি। এমনিতে যখন কোনো অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ আসে, আমরা যাই। কিন্তু যে সম্মানটা আমাদের প্রাপ্য তা আমরা পাই না। রাশেদা আপার কাছে আমার দাবি, যেন আমাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে মর্যাদা দেওয়া হয়।
মতিউর রহমানঃ এখন বলবেন বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মনজুরুল আলম।
মনজুরুল আলমঃ আমাদের দেশে এত গুণী ও উঁচু মানের শিল্পী আছেন, কিন্তু সে হিসেবে তাঁদেরকে মূল্যায়ন করা হয় না। আমি এটা অকপটে স্বীকার করি। আমি চাচ্ছিলাম, আমাদের শিল্পীদের জন্য একটা তহবিল করা দরকার, যেন প্রয়োজনীয় মুহূর্তে ওখান থেকে টাকা নেওয়া যায়। কেন অনুষ্ঠান করে একজন শিল্পীর জন্য টাকা নিতে হবে?
আজ যে বিষয়টা তুলে আনা হলো এটা সঠিক সময়ে নেওয়া হয়েছে। বিটিআরসি থেকে আমরা কনটেন্ট সেবাদাতাদের অনুমোদন (লাইসেন্স) দিতে যাচ্ছি। বাংলাদেশে এই কনটেন্ট সেবাদাতারা খুব বেশি রকমের প্রতারিত হচ্ছে মোবাইল ফোন কোম্পানির দ্বারা। এটা স্পষ্টই এক ধরনের মাস্তানি। এই ছেলেরা বাবার পেনশনের টাকা নিয়ে বিভিন্ন কনটেন্ট নিয়ে মোবাইল ফোন কোম্পানিকে দেয়। এক লাখ ডাউনলোড বা আপলোড করুক, বিল দেওয়ার সময় বলে, ৫০ হাজার হয়েছে। এখন যদি বলে ৫০ হাজার কেন? তখন বলে, নিলে নাও, না নিলে চলে যাও।
আজকে এখানে দেখলাম যে এটা বিরাট একটা জিনিস, এটা করতে পারলে আমি চেয়ারম্যান এবং ব্যক্তি মনজুর হিসেবে বেশি খুশি হব। কী করতে পারব সেটা হচ্ছে কথা। সবকিছু আমার প্রতিষ্ঠান করতে পারবে না। দেশে কপিরাইটের মতো বোর্ডগুলো অবহেলা করা হয়। আমি মনে করি, ওই ২০ জন লোকের প্রতিষ্ঠানে ১২ জন, তার মধ্যে আছে দুজন কর্মকর্তা। এত কম লোক দিয়ে এ কাজ হবে না। তারা যত চেষ্টা করুক, এটা করা যাবে না। এ ধরনের অধিদপ্তরগুলোকে অবহেলা করা হয়। এগুলো গুরুত্ব দিতে হবে। কপিরাইট বোর্ডকে স্বায়ত্তশাসিত করতে হবে। সরকার এসব প্রতিষ্ঠানের পিলারগুলো শক্ত করে দিন, দেয়াল তৈরির দায়িত্ব আমাদের। দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোকদের বসাতে হবে এসব প্রতিষ্ঠানে।
রিংটোনে কতগুলো গান বাজানো হলো। যাঁদের গান বাজানো হলো তাঁদের বকেয়া কি পাওয়া যাবে? মোবাইল অপারেটরদের সার্ভারে এসব বিষয় রেকর্ড করা আছে। অপারেটরদের সঙ্গে বসে আমরা সেই অধিকার সংরক্ষণ করব। অপারেটর ও শিল্পীদের নিয়ে একসঙ্গে বসে ওই বকেয়া টাকা আদায় করব আমরা। এ ব্যাপারে দেনদরবার করতে হবে।
মতিউর রহমানঃ রাশেদা আপা (রাশেদা কে চৌধুরী), আপনারা আছেন আর মাত্র চার মাস, তাই সবকিছু করা আপনার জন্য সম্ভব নয়। আপনি হয়তো দু-একটা পদক্ষেপ নিতে পারেন। আপনার প্রতিষ্ঠানকে কিছু শক্তিশালী করতে পারবেন। এটুকু করলে আমার মনে হয় কাজটা অনেক দূর এগিয়ে যাবে। আমাদের অভ্যাস হলো, আমরা সবকিছু সরকারের কাছে চাই। সমষ্টিগতভাবে শিল্পীসমাজ, বিটিআরসি, সরকার এবং সবাই মিলে শিল্পীদের সমস্যাটা অনুভব করুক-এটাই আমাদের চাওয়া।
রাশেদা কে চৌধুরীঃ আমি সবাইকে দেখে খুবই আনন্দ অনুভব করেছি। এখানে অনেকেই আছেন, আমি যাঁদের ভক্ত। আমি নিজেকে একজন সংস্কৃতিসেবী হিসেবে এবং সংস্কৃতি অঙ্গনের সহায়তাকারী হিসেবে মনে করি। আর সরকার সম্পর্কে সব সময় একটা উদাহরণ আমার মনে হয়, সরকার বিশাল একটা জাহাজের মতো। নড়তে-চড়তে সময় লাগে, খালেবিলে ঢুকতে পারে না। খালেবিলে ঢোকার জন্য প্রথম আলোর মতো গণমাধ্যম আমাদের দরকার। সে সহায়তাটা দিয়েছেন বলে বেসরকারি উদ্যোগ হিসেবে প্রথম আলোকে অনেক কৃতজ্ঞতা জানাই। সরকার অনেক সংস্কার হাতে নিয়েছে। আপনারা শিল্পীদের দুর্দশার কথা বলেছেন, আরেকটি হলো অসুস্থতা। এটা নিয়ে কাজ করতে গিয়েই আমাদের দৃষ্টিতে কপিরাইট আইন ও মেধাস্বত্বের বিষয়গুলো চলে আসে। এ বিষয়গুলো সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। সেটা যদি আমরা যথাযথভাবে করতে পারি, তাহলে একটা কাজের কাজ হবে। আপনারা শিল্পী কল্যাণ তহবিলের কথা বলেছেন। আপনারা জানেন কি না জানি না, ২০০৬ সালে একটি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য (কালচারাল অ্যান্ড হেরিটেজ) ফাউন্ডেশন নামে একটি সংগঠন কোম্পানি অ্যাক্ট নিবন্ধন করা হয়েছে। এটা ওখানেই বসে আছে। কালচার অ্যান্ড হ্যারিটেজ ফাউন্ডেশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। সারাক্ষণ মন্ত্রণালয়ে ধরনা দিতে হবে না, কমিটির কাছে ধরনা দিতে হবে না। শিল্পীদের জন্য কী করা যায়, কমিটি নিজেরাই দায়িত্ব নেবে। কপিরাইটের ক্ষেত্রেও তারা কিছু সহায়তা করতে পারে। স্বল্প সময় কিছু কাজ করা যায়। যেমন, প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা শক্তিশালী করতে পারি।
দ্বিতীয় কথাটা, রুনা লায়লার প্রতি সম্মান জানিয়ে বলতে চাই। যেসব শিল্পী জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় পদক বা সম্মান পান, তাঁদের ব্যাপারে। প্রধান উপদেষ্টার কাছে আমাদের একটা প্রস্তাব যাচ্ছে, উনি যে প্রস্তাবটা করেছেন, এঁদের যেন ওই পদকটা দেওয়ার পরেই ভুলে না যাই। আশা করছি এটা হয়ে যাবে।
কপিরাইট নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমাদের মনে হয়েছে যে, অনেকগুলো প্রক্রিয়া আমরা কিন্তু শুরু করেছি। মতি ভাইয়ের কথা সূত্র ধরে বলি, চার মাসে কী করতে পারব? আসলে এ দায়িত্বটা নেওয়ার পরে আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে, সরকার স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘ মেয়াদে এই কাজগুলো করতে পারে। এক্ষুনি করা সম্ভব যে কাজগুলো, সেগুলোতে আমরা হাত দিয়েছি এবং কিছু কাজ করে ফেলেছি। আর দ্বিতীয় হচ্ছে, স্বল্পমেয়াদি প্রক্রিয়া, আমরা করে যাব, যেটা হয়তো পরবর্তী সময়ে আপনাদের সঙ্গে থেকেই করে যাব। তখন একসঙ্গে এটাকে সামনে নিয়ে যাওয়া যাবে। দীর্ঘমেয়াদির মধ্যে আছে অনেকগুলো রিসোর্স রিলেটেড কাজ। যেখানে হয়তো অনেক অর্থ জোগান দিতে হতে পারে। মধ্যমেয়াদির মধ্যে একটা আছে যে কপিরাইট অফিসটাকে সম্প্রসারিত করা। আমি আপনাদের সবার সঙ্গে একমত, পেশাদার লোকজন দিয়ে আমরা এসব অফিস তৈরি করিনি। যাঁদের দায়িত্ব দিয়েছি, তাঁদের হয়তো ওই অভিজ্ঞতা নেই। অথবা আমলারা গুরুত্ব দেয়নি। আমি আশা করছি, সেপ্টেম্বর নাগাদ এ কাজ হয়ে যাবে। যদি বাইরে থেকেও অভিজ্ঞ লোকজন আনতে হয়, আমরা আনব। কিন্তু যেখানে আমরা আটকে যাচ্ছি তা হলো, কপিরাইট-সংক্রান্ত কিছু আইন এখানে নেই। যেমন মোবাইল রিংটোন ডাউনলোড-সংক্রান্ত বিষয়গুলো। কপিরাইট আইনের সংস্কার আনা প্রয়োজন এবং সেটার জন্য আমরা একটা দলকে দায়িত্ব দিয়েছি। কপিরাইট আইনের ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়টা চলে এসেছে। কারণ সাধারণ মানুষ কিন্তু এটা সম্পর্কে জানে না।
কাজটা করার জন্য আমরা একটা টাস্কফোর্স গঠন করেছি। আমরা একটা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছি। সচেতনতা বৃদ্ধি, কারিগরি বিষয়, যেমন-বকেয়া পাবে কি না, কাদের সঙ্গে কী করা যাবে এবং বিটিআরসির ভূমিকাকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছি। তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তারা মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বসবে। আমরা কিছুটা মধ্যস্থতা করব। আমাদের একটা গোয়েন্দা দল ইতিমধ্যে কাজ করছে, কারা কারা কপিরাইট আইন লঙ্ঘন করছে সেটা দেখছে। আমাদের গোয়েন্দার হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা বেশি না, আট থেকে ১০টা। তাদের সঙ্গেও আমরা বসব। তাতেও যদি কাজ না হয়, আমরা আইন প্রয়োগ করতে নামব। সে কারণে আমরা টাক্সফোর্স গঠন প্রক্রিয়া প্রায় সমাপ্ত করেছি। এ কাজে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি আছে। যৌথ বাহিনী আছে। তবে কপিরাইট আইনের মধ্যে শুধু সংগীত বা চলচ্চিত্র না, এতে প্রকাশনা শিল্পও আছে। তবে তার মানে এই নয়, গাড়ি থামালে যে বাচ্চাটা বইয়ের ফটোকপি বিক্রি করছে তাকে ধরে নিয়ে যাবে। তবে সব কাজ হয়তো আমরা করতে পারব না, কিছু কাজ করব কিছু কাজ প্রক্রিয়াধীন থেকে যাবে। তবে আমার দুটি দাবি আছে। নিজস্ব ফোরামে কাজ করতে হবে। আর যারা ব্যবহার করল তাদের এবং যারা সুবিধাভোগী-উভয়কেই একসঙ্গে আনতে হবে। সবার সঙ্গে বসে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। সে ক্ষেত্রে আপনাদের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। আর তা না হলে শুধু শিল্পীরা নয়, গোটা শিল্পই ধ্বংস হয়ে যাবে। পাঁচ বছর আগে এক হাজার ৩০০ সিনেমা হল ছিল। এখন এর সংখ্যা মাত্র ৬০০। আমরা শিল্পী-সংস্কৃতিসেবীদের একটি তালিকা তৈরি করছি। শিল্পীদের স্বপ্ন দেখা দরকার।
সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো, আগস্ট ২৮, ২০০৮
Bangla Music Tags: আবিদ, আবিদা সুলতানা, আলম খান, আলাউদ্দিন আলী, এন্ড্রু কিশোর, কনকচাঁপা, কাওসার আহমেদ চৌধুরী, কুমার বিশ্বজিৎ, খুরশীদ আলম, প্রিন্স মাহমুদ, ফরিদা পারভীন, ফাহমিদা নবী, বাপ্পা মজুমদার, মমতাজ, রফিকুল আলম, রাশেদ, রুনা লায়লা, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, লাকী আখান্দ্, শান্ত, শুভ্র দেব, শেখ সাদী খান, সৈয়দ আব্দুল হাদী, হাসানRelated posts
Bangla Music : Incoming search terms
- কপিরাইট আইন (6) - জেনারেল মনজুর বিটিআরসি (1) - রিংটোন (1) - ওরে নীল দরিয়া (1) -

Post Your Comments