মৃত্যুর পর কোনো পদকের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না : শেখ সাদী খান

Sheikh Shadi Khan - Bangla Music
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট নতুন জাগরণে উদ্বুদ্ধ হয়ে যে কয়জন প্রতিভাবান সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক বাংলাদেশের আধুনিক সঙ্গীতে নতুন ধারা প্রবর্তন করেন, আধুনিক সঙ্গীতকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে স্থাপন করেন, সে স্থপতিদের অন্যতম হচ্ছেন শেখ সাদী খান। তার সুর করা গানের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে, তুমি রোজ বিকেলে আমার বাগানে ফুল নিতে, তোমার চন্দনা মরে গেছে, আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়, ডাকে পাখি খোল আঁখি, একি খেলা চলছে হরদম, কাল সারা রাত ছিল- তার সুর করা এ ধরনের অসংখ্য জনপ্রিয় গান রয়েছে। সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন শতাধিক চলচ্চিত্রে। সম্প্রতি যায়যায়দিনে এসেছিলেন তিনি। তার সৃষ্টিকর্ম, অপ্রাপ্তি ইত্যাদি বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন সৌরভ রাহমান ও ছবি তুলেছেন শরীফ সারওয়ার

শৈশব কেটেছে কোথায়?
১৯৫০ সালের ৩ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত পরিবারে আমার জন্ম হয়। প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পরে কুমিল্লায় আমার শৈশব কাটে। শৈশবে প্রচ- ডানপিটে ছিলাম আমি। ক্রিকেট ও ফুটবল খেলতাম।

সঙ্গীতের সঙ্গে কিভাবে যুক্ত হলেন?
আমি সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ঘরানার একজন সদস্য। সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ জ্যাঠা, বাবা উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুর সাধক ওস্তাদ আয়েত আলী খান। যে পরিবার পঞ্চম পুরুষ পর্যন্ত সঙ্গীতচর্চা করে চলেছে। ফলে পারিবারিকভাবে সঙ্গীতের প্রতি আমার সহজাত আকর্ষণ জন্মে। এক্ষেত্রে বাবা ও মায়ের প্রেরণা ছিল বেশি। বাবার কাছে প্রথমে তবলায় পরে বেহালায় হাতেখড়ি হয়।

শিক্ষা জীবন সম্পর্কে কিছু বলুন?
আমার পড়াশোনা শুরু হয় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে। এরপর ঢাকায় এসে ধানম-ি হাই স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। ঢাকা সঙ্গীত মহাবিদ্যালয় থেকে আইমিউজ ও বিমিউজ সম্পন্ন করি কৃতিত্বের সঙ্গে। ১৯৬৩ সালে মেজভাই প্রখ্যাত সরোদ বাদক ওস্তাদ বাহাদুর খান বেহালায় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শেখার জন্য আমাকে ভারতে নিয়ে যান। তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে তিন বছর তালিম গ্রহণ করি। সেখানে অনেক সঙ্গীত গুরুর সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য হয় আমার। ১৯৬৫ সালের দিকে বাংলাদেশে ফিরে আসি।

চাকরি জীবন সম্পর্কে কিছু বলুন?
১৯৬৫ সালে বাংলাদেশে ফিরে বেহালা বাদক হিসেবে রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রামে যোগদান করি। তিন বছর সেখানে চাকরির পর তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনে যোগদান করি বেহালা বাদক হিসেবে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হই। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ বেতারে যোগদান করি সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে। এরপর দীর্ঘ চাকরি জীবন শেষে ২০০৭-এর মার্চে মুখ্য সঙ্গীত প্রযোজক হিসেবে অবসরগ্রহণ করি।

গানে সুরারোপ শুরু করলেন কখন?
১৯৬৯-এর দিকে বেহালা বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে গানে সুর করার অনুশীলন শুরু করি। এসময় কিছু কিছু শিল্পীর জন্য সুর করতে থাকি। কিছু কিছু গান রেডিও-টেলিভিশনে প্রচার হতে থাকে। আমার সুর করা গান যখন শ্রোতাদের ভালো লাগতে লাগলো তখন আমি আরো অনুপ্রাণিত হই। এরপর তখনকার বিখ্যাত মিউজিক কোম্পানি হিজ মাস্টারস ভয়েজ অর্থাৎ এইচএমভিতে সুর ও সঙ্গীত পরিচালনার সুযোগ পাই। শিল্পী মৌসুমী কবির ও শওকত হায়াত খানের কণ্ঠে আমার সুর ও সঙ্গীত পরিচালনায় চারটি গান রেকর্ড করা হয়। তখনকার জন্য এটি ছিল একটা বিশাল ব্যাপার।

আপনার পরিবারের সবাই যন্ত্রসঙ্গীতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আপনি ব্যতিক্রম, কারণ কি?
আসলে বেহালা বাজিয়ে আমি মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করতে পারছিলাম না। এজন্য সুর করা শুরু করলাম। এরপর মানুষ যখন আমার সুর করা গান শুনে মুগ্ধ হতে থাকলো, তখন মনে হলো আমি ভুল করিনি।

বাংলাদেশের আধুনিক সঙ্গীতে নতুন ধারা প্রবর্তন ও আধুনিক সঙ্গীতের জনপ্রিয়তায় আপনার প্রচেষ্টা সম্পর্কে বলুন?
মূলত স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যে নতুন জাগরণের সৃষ্টি হয়, যে আধুনিক চেতনার জন্ম হয়, তাতে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা আধুনিক সঙ্গীতে নতুন ধারা প্রবর্তনের প্রচেষ্টা চালাই। আমরা বলতে আমি ছাড়াও আলম খান, আনোয়ার পারভেজ, আলাউদ্দিন আলী প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আমাদের প্রচেষ্টায় আধুনিক গান জনপ্রিয়তার শীর্ষ স্থান লাভ করে। আজো আমাদের গান মানুষের মুখে মুখে ও হৃদয়ে গেঁথে আছে, মানুষের মন কেড়ে নেয়।

আপনার সঙ্গীত পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ছবির কথা বলুন?
কলমিলতা, এখনই সময়, বংশধর, সুখের সন্ধানে, পরিণীতা, মোহনা, মহানায়ক, পোকামাকড়ের ঘরবসতি, হাঙর নদী গ্রেনেড, উত্তরের খেপ, ঘানি, প্রেমের প্রতিদানসহ বহু চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করি।

মাঝে বেশ কয়েক বছর সঙ্গীত পরিচালনা করেননি, কারণ কি?
মাঝে চলচ্চিত্র শিল্পে যে অশ্লীলতার অনুপ্রবেশ ঘটে তারই প্রতিবাদস্বরূপ বেশ কয়েক বছর চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করিনি।

বর্তমানে কোনো চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করছেন কি না?
ইদানীং চলচ্চিত্র শিল্পে আবার সুবাতাস বাইতে শুরু করেছে, তাই আবার কাজ করা শুরু করেছি। এটিএন বাংলার প্রযোজনায় চাষী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় দুই পুরুষ চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করছি।

আপনার পরিবার এবং আপনার সফলতায় পরিবারের প্রেরণা কতোটুকু ছিল?
আমার একমাত্র ছেলে রওনাক ফেরদৌস খান জোনাক এমবিএ করে স্ত্রী শবনম শারমিনকে নিয়ে লন্ডনে থাকে। মেয়ে সাগুফতা জাবীন নূপুর এইচএসবিসি ব্যাংকের কর্মকর্তা, মেয়েজামাই জাহিদুর রহমান ইস্টার্ন ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট। একমাত্র নাতনি আয়ানথী। সবারই ভালোবাসা, মমতা ও আদর আমার সফলতায় প্রেরণা জুগিয়েছে। তবে বিশেষভাবে আমার স্ত্রী রওশন আরা বেগমের নাম স্মরণ করছি। তার সহযোগিতা না পেলে আমি এ পর্যন্ত আসতে পারতাম না।

আপনাকে বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশের আধুনিক সঙ্গীতের স্থপতিদের একজন। কিন্তু আজো জাতীয় পুরস্কার পাননি। রহস্যটা কি?
জাতীয় পুরস্কার দেয়ার জন্য যারা জুরি বোর্ডে রয়েছেন তাদের হীনম্মন্যতা, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক বিবেচনা এর অন্যতম কারণ। আমি কোনো রাজনীতি করিনি, সস্তা গান করিনি। আজীবন শুদ্ধ সঙ্গীতের বিকাশে প্রচেষ্টা চালিয়েছি। কিন্তু আমাকে কেন জাতীয় পুরস্কার দেয়া হলো না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাই; কোন ধরনের সঙ্গীত করলে জাতীয় পুরস্কার দেয়া হয়। শ্রদ্ধেয় আনোয়ার পারভেজ সঙ্গীতের ক্ষেত্রে এতো অবদান রাখলেন কিন্তু তাকে জাতীয় পুরস্কার দেয়া হলো মৃত্যুর পর। আমি বলছি, আমার পরিবার আমার মৃত্যুর পর কোনো জাতীয় পুরস্কার গ্রহণ করবে না।

এখনকার সঙ্গীত সম্পর্কে কিছু বলুন?
এখনকার সঙ্গীতে পাশ্চাত্য প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। প্রায় গানই এডিটিং হচ্ছে, মনে হয় যেন ফ্যাক্টরিতে তৈরি হচ্ছে। তবে কিছু কিছু ভালো গানও হচ্ছে।

সঙ্গীতের বাণী, মিউজিক ভিডিও ইত্যাদিতে অশ্লীলতার ছড়াছড়ি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, করণীয় কি?
সেন্সর বোর্ড, টাস্কফোর্স ইত্যাদি গঠনের ফলে চলচ্চিত্র অশ্লীলতা মুক্ত হতে চলেছে। একই ব্যবস্থা গ্রহণ করে সঙ্গীতের অশ্লীলতাও দূর করা সম্ভব। আর এ কাজটা করা সরকারের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

আপনি চ্যানেল ওয়ানের ওয়ান্ডার ভয়েস অফ বাংলাদেশের বিচারকম-লীর উপদেষ্টাম-লীর সদস্য। প্রতিযোগীদের কোন কোন যোগ্যতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন?
চমৎকার কণ্ঠ, গায়কী, উপস্থাপনা, আচরণ, শিক্ষা সব কিছুই দেখা হচ্ছে। একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পীসত্তা যাদের আছে, তাদের আবিষ্কার করে দেশীয় সঙ্গীত, সংস্কৃতির প্রতিনিধি হিসেবে তাদের উপস্থাপন করতে চাই।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলুন?
সব ধরনের শুদ্ধ সঙ্গীতচর্চা ও গবেষণার উপযোগী করে আন্তর্জাতিক মানের একটি বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চাই। আমি বড় ধরনের পৃষ্ঠপোষক খুঁজছি। পৃষ্ঠপোষক পেলেই ইনশাল্লাহ কাজ শুরু করবো।

সূত্রঃ যায়যায়দিন।

Bangla Music Tags: , , ,

Related posts

Post Your Comments

*
To prove you're a person (not a spam script), type the security text shown in the picture. Click here to regenerate some new text.
Click to hear an audio file of the anti-spam word

Bangla Music : Incoming search terms