ভারতের সংগীত প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের জেমস
সপ্তাহের বৃহস্পতি থেকে রবিবার রাতে ভারতীয় দর্শকপ্রিয় চ্যানেলগুলোতে রিমোট ঘোরালেই পাওয়া যাবে ‘প্রতিভা অম্বেষণ’ অনুষ্ঠান। মজার বিষয় হলো, প্রতিটি প্রতিযোগিতায় আমাদের জেমসের গাওয়া হিন্দি গানগুলো গাইতে দেখা গেছে বিভিন্ন প্রতিযোগীদের। বিষয়টি এমন হয়েছে যে, জেমস সেখানে না থেকেও যেন আছেন। সে প্রসঙ্গে পরে আসি। আগে এই প্রতিভা অম্বেষণের কথাই বলি।
প্রতিযোগিতামূলক এই ধরনের অনুষ্ঠানগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ভারতের খ্যাতিমান সব সঙ্গীতজ্ঞ যেন গান ছেড়ে ঝগড়া করতে বসেছেন। গান নিয়ে ‘প্রতিভা অম্বেষণ’-এর ফাঁকে এসব যুদ্ধ দেখতে মজাই পায় দর্শক। হয়তো এ কথা বুঝতে পেরেই টিভি চ্যানেলের মালিকেরা কোনো বাধা দিচ্ছেন না বিচারকদের। তবে ঝগড়ার খেলায় জিটিভির সারেগামাপা এবং স্টার প্লাসের ভয়েস অব ইন্ডিয়া এগিয়ে থাকলেও টিআরপি রেটিং অনুযায়ী জনপ্রিয়তায় এগিয়ে সনির ইন্ডিয়ান আইডল। কৌশলী প্রচারণা, ব্রান্ড নাম এবং অভিজ্ঞ পরিচালনার কারণেই হয়তো ইন্ডিয়ান আইডল-এর জনপ্রিয়তা বেশি। তবে যারা সংগীতবোদ্ধা, তারা বরং ইন্ডিয়ান আইডল-এর চেয়ে ভয়েস অব ইন্ডিয়া দেখতেই স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কারণ ভয়েস অব ইন্ডিয়াতে চাকচিক্য কম থাকলেও ভালো শিল্পীর সংখ্যা বেশি। ভারতের ছয়টি শহর থেকে ৩২ জনকে খঁুজে এনে শুরু হয়েছে প্রথম ভয়েস অব ইন্ডিয়ার আসর। অন্যদিকে সারেগামাপাও পিছিয়ে নেই। সমগ্র বিশ্ব থেকে ২৪ জনকে বাছাই করে পাঁচ বিচারক (বাপ্পী লাহিড়ী, ইসমাইল দরবার, বিশাল-শেখর, হিমেশ রেশামিয়া) প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন নতুন শিল্পীদের। স্বাভাবিকভাবে বিচারকাজের দিক দিয়ে এই অনুষ্ঠানে পক্ষপাতিত্বের প্রভাব তুলনামূলক বেশি। সে তুলনায় ইন্ডিয়ান আইডল-এর চার বিচারক (জাভেদ আখতার, অনু মালিক, উদিত নারায়ণ, আলিশা চিনয়) তাঁদের প্রিয় শিল্পীদের গানের মান খারাপ হলেও সত্য কথা বলতে দ্বিধা করেন না। এখানে বিচারক প্যানেলেও আছে ভারসাম্য (গীতিকার, সুরকার, গায়ক, গায়িকা)। ভয়েস অব ইন্ডিয়াতে গায়ক (অভিজিৎ), গায়িকা (অলকা ইয়াগনিক), সুরকার (আদেশ শ্রীবাস্তব, যতিন-ললিত) থাকলেও গীতিকার নেই।
বাংলাদেশের দর্শক প্রথম ইন্ডিয়ান আইডল নিয়ে যতটা উ্নাতাল ছিল, গতবার ছিল ততটাই নিরুৎসাহী। এবার সে তুলনায় তারা অনেক বেশি সজাগ। অবশ্য শুধু বাংলাদেশের দর্শকই নয়, বাংলাদেশের শিল্পী জেমসকে নিয়েও তোলপাড় ভারতের এই প্রতিভা অন্বেষণ অনুষ্ঠানগুলো। গ্যাংস্টার ছবিতে জেমসের গাওয়া ‘ভিগি ভিগি রাতে’ গানটি যেন জাতীয় সংগীতে পরিণত হয়েছে এই অনুষ্ঠানগুলোতে। তা ছাড়া জেমসের ‘চাল চালে’ (ও লামহে), ‘আলবিদা’ (মেট্রো) গানগুলোও গাইছেন নতুন শিল্পীরা। তবে এখানে লক্ষণীয়, ভালো শিল্পীরাও জেমসের কণ্ঠের ধারে-কাছেও যেতে পারছেন না। ভয়েস অব ইন্ডিয়া অনুষ্ঠানে ইরফান গেয়েছিলেন জেমসের গান। ভাগ্যে প্রশংসা জুটলেও ইরফানকে অতিথি বিচারক মহেশ ভাট বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, জেমসের কণ্ঠের ধারে-কাছে যাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। জেমস হলেন এশিয়ার জিম মরিসন। এমনকি ইন্ডিয়ান আইডল-এ বাদপড়া প্রতিযোগী অভিষেক কুমার যাচ্ছেতাইভাবে ‘ভিগি ভিগি’ গানটি গাওয়ার পর বিচারক অনু মালিক বলেছিলেন, গানটির শিল্পী এত ভালো গেয়েছিলেন যে, সবারই তা কানে লেগে আছে। তাঁর সঙ্গে তুলনাটা তাই এসেই যায় এবং এই তুলনায় অনেক ভালো শিল্পীর কণ্ঠও ম্লান হয়ে যায়।
উপস্থাপক নির্বাচনের ক্ষেত্রে চমক দিয়েছে সারেগামাপা। উদিত নারায়ণের ছেলে টিনেজার আদিত্য নারায়ণ এখন অনেক তরুণ-তরুণীরই নতুন হূৎকম্পন। জিটিভিতে আগে সারেগামাপা প্রযোজনা করে যাওয়া গজেন্দ্র সিং তাঁর পুরো দলকে নিয়ে এখন স্টার প্লাসে ভয়েস অব ইন্ডিয়া নির্মাণ করছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাই গত বছরগুলোর সারেগামাপার উপস্থাপক শান এবার ভয়েস অব ইন্ডিয়ার সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করছেন। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং দর্শকের কাছাকাছি আসতে পেরেছেন ইন্ডিয়ান আইডল-এর মিনি মাথুর ও হুসেন বার্মাওয়ালা। এই অনুষ্ঠানটি এখন শেষ তিনে এসে পেঁৗছেছে। কলকাতার ইমন, দার্জিলিংয়ের প্রশান্ত ও শিলংয়ের অমিত পালের মধ্যে একজন হবেন ইন্ডিয়ান আইডল। বাদপড়া দীপালি, পূজা, চ্যাং, অংকিতা, পার্লিনকে নিয়ে বিচারকেরা আশা করলেও ভারতের দর্শক বরাবরের মতো গান না শুনে অন্যান্য কারণ দেখে ভোট করেছে। অংকিতার মতো গায়িকার সেরা-৪ পর্যন্ত আসা সম্ভব হয়েছে দর্শকের বিচার-বিবেচনা ছাড়া ভোটের কারণেই। এই ধারা বজায় থাকলে এবার প্রশান্তর জন্য ইন্ডিয়ান আইডল হওয়াটাও অসম্ভব কিছু নয়! যদিও সংগীতবোদ্ধারা মনে করেন, অমিত ও ইমনের মধ্যে চূড়ান্ত পর্বটা হলে জমত ভালো। বাংলা, নেপালি, তেলে÷, ইংরেজি, অসমিয়া, বোরডিয়া, খাশি-সাতটি ভাষায় গান জানা অমিত ইন্ডিয়ান আইডল হোন এটা এখন চার বিচারকই চাইছেন। তবে শেষ পর্যন্ত তা কে হবেন-ভারতের দর্শকই জানে।
ভয়েস অব ইন্ডিয়াতে লড়াই চলছে আভাস, অভিলাশা, হার্ষিত, ইরফান, ই্নিত, মিরান্দে, প্রিয়ানী, সুমিত্রার মধ্যে। এর মধ্যে হার্ষিত ভারতের সেরা কণ্ঠ হোন-চাইছেন বাংলাদেশের দর্শক এবং সংগীতবোদ্ধারা। তুলনামূলকভাবে সারেগামাপাতে নতুন শিল্পীরা বেশি প্লেব্যাকে কাজ করার প্রস্তাব পাচ্ছেন। ছত্তিশগড়ের সুমেধা ইতিমধ্যেই প্লেব্যাক করেছেন। সুমেধা ছাড়াও রাজা হাসান (রাজস্থান), মুসাররাত আব্বাস (পাকিস্তান), পুনম (উত্তর প্রদেশ), মৌলি (আমেরিকা), অনিক ধার (কলকাতা), আমানত আলী (লন্ডন) লড়াইয়ে টিকে আছেন। তবে রাজা হাসান এবারের বিজয়ী হোন-এটা সংগীতবোদ্ধাদের কামনা।
তবে যেহেতু ‘রিয়্যালিটি শো’, বলা যায় না শেষ হাসি কে হাসবেন। হিন্দি ডেইলি সোপগুলোর ‘বাজ’ পড়ার শব্দ যেখানে এই অনুষ্ঠানগুলোতে ভর করেছে, সুতরাং যেকোনো কিছুই সম্ভব এগুলোতে। কারণ ভারতের দর্শক গান শোনে কম, চাকচিক্যে মেতে থাকতেই তারা বেশি অভ্যস্ত।
সূত্রঃ প্রথম আলো, সেপ্টেম্বর ০৬, ২০০৭
Bangla Music Tags: James
Post Your Comments