ভক্তদের ভালোবাসার কফিনে শহীদুল্লাহ ফরায়জী
ভক্তদের ভালোবাসার উচ্ছ্বাসে প্রতিদিনই নিজেকে সমৃদ্ধ করতে চান হাজারো ভক্তের ভালোবাসায় সিক্ত গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফরায়জী। নিমগ্ন ভাবনার অতল গভীর থেকে নিজেকে তুলে এনে তিনি বলেন, যদি এমন হতো, ভক্তদের সব ভালোবাসা জমাট করে কোনো কফিন বানানো যেতো আর সেই কফিনে আমার মৃতদেহ রেখে আমাকে মাটি চাপা দিতে পারতো, তবে ভক্তদের ভালোবাসা নিয়ে এপার ওপার দু’পারেই মুগ্ধ থাকতে পারতাম আমি।
গানের জগতে ভক্ত শব্দটি জড়িয়ে থাকে শিল্পীর সঙ্গে। একজন শিল্পীর গান শুনে তৈরি হয় তার ভক্ত। শহীদুল্লাহ ফরায়জী শিল্পী নন, সুরকার কিংবা সঙ্গীত পরিচালকও নন, তবু তারও রয়েছে অজস্র ভক্ত-শ্রোতা। শুধু গান লিখে নিজস্ব একটা ভক্ত শ্রেণী তৈরি করা এবং প্রতিনিয়ত তাদের ভালোবাসায় অবগাহন করা বাংলা গানের ইতিহাসে খুব কম গীতিকারের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শহীদুল্লাহ ফরায়জীই সবচেয়ে সফল ব্যক্তি। দেশে ও দেশের বাইরে হাজারো ভক্ত-শ্রোতা রয়েছে তার। তাদের কেউ চিঠি লিখে, কেউ ফোন করে, কেউ এসএমএসের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত শুভেচ্ছা জানান তাকে।
অনেক ভক্ত আবার প্রিয় গীতিকারের জন্য নানা রকম উপহার সামগ্রী পাঠান। এসব উপহারের মধ্যে থাকে পারফিউম, কার্ড, ডায়েরি, রঙ-বেরঙের কলম, স্লিপ প্যাড, বৈচিত্র্যপূর্ণ খাম, রঙিন মোম, আরো অনেক কিছু। এছাড়া প্রতি জন্মদিনে পাজামা-পাঞ্জাবি, শার্ট-প্যান্ট, চকোলেট বক্স, ফলমূলসহ আরো নানা রকম উপহার পান। কিছুদিন আগে ফিনল্যান্ড থেকে এক ভক্ত পাঠিয়েছেন গোলাপি কলম, গোলাপি খাম, গোলাপি ডায়েরি, গোলাপি স্লিপপ্যাড। এমনিভাবে আমেরিকা, লন্ডন, কানাডা, সিঙ্গাপুর, কুয়েত, আরব আমিরাত, দুবাই, মালয়েশিয়া, ভারতসহ নানা দেশ থেকেই ভক্তরা নানা রকম উপহার সামগ্রী পাঠান। ভক্তদের কাছ থেকে উপহার পাওয়া আনন্দের হলেও কিছু কিছু উপহার শহীদুল্লাহ ফরায়জীকে বিব্রতও করে। এমনি এক উপহারের কথা শোনা যাক তার মুখেই- সৌদি আরব থেকে কিছু কিছু ভক্ত প্রায়ই সেখানে বেড়াতে যেতে বলে। আমি রাজি হলে যাওয়া-আসার টিকেটসহ যাবতীয় সব ব্যবস্থা ওরাই করবে বলে জানায়। তো প্রায় বছর দুয়েক আগে সৌদি আরব থেকে এক ভক্ত খামে ভরে কিছু নগদ টাকা পাঠায় এবং চিঠিতে লিখে জানায়, সে বুঝতে পারছে না আমার জন্য কি উপহার কিনবে। এ টাকা দিয়ে আমি যেন পছন্দমতো উপহার কিনে নেই। ব্যাপারটা আমাকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। পরবর্তী চিঠির সঙ্গে আমি টাকাগুলো ফেরত পাঠাই এবং লিখে জানাই, দেশে এলে আমি তার কাছ থেকে উপহার নেবো। এরপর থেকে সে আর যোগাযোগ করেনি। হয়তো খুব কষ্ট পেয়েছে। আমারও খুব খারাপ লেগেছে যে, আমি তার অনুভূতির যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারিনি।
এ রকম ২-১টি বিব্রতকর ঘটনা বাদ দিলে ভক্তদের নিয়ে বেশির ভাগ ঘটনাই একজন গীতিকার হিসেবে শহীদুল্লাহ ফরায়জীর জন্য আনন্দ, উৎসাহ-উদ্দীপনা আর সার্থকতার। দুবাইয়ের একটি আবাসিক হোটেলে নিয়মিত গান করেন বাংলাদেশের শিল্পী রোনক। ওই প্রোগ্রামে কোনো গানের অনুরোধ করতে হলে তার জন্য অতিরিক্ত টিকেট কিনতে হয়। তো একজন শ্রোতা টিকেট কিনে শহীদুল্লাহ ফরায়জীর যে কোনো একটি গান গাওয়ার অনুরোধ করলেন। রোনক জানালেন, শহীদুল্লাহ ফরায়জী তার খুব ঘনিষ্ঠজন। শুনে ওই শ্রোতা বললেন, ঘনিষ্ঠ হলে আপনি তার কাছ থেকে গান নিতে পারেন না কেন? প্রায় ৪-৫ মাস আগে রোনক দেশে এসে শহীদুল্লাহ ফরায়জীর সঙ্গে দেখা করে এ ঘটনা জানান।
অনেক শিল্পীই এভাবে শহীদুল্লাহ ফরায়জীর সঙ্গে পরিচয় বা ঘনিষ্ঠতা আছে বলে গর্ব বোধ করেন এবং মানুষের কাছ থেকে আলাদা সম্মান লাভের চেষ্টা করেন। আমেরিকা থেকে আফসানা সিরাজ নামে একজন শিল্পী এসে শহীদুল্লাহ ফরায়জীকে অনেক অনুরোধ করে দুটি গান নিয়েছেন। ওয়ার্ল্ড মিউজিক থেকে প্রকাশিত ওই শিল্পীর অ্যালবাম প্রেমের ক্রীতদাসীর প্রকাশনা অনুষ্ঠান করা হয় আমেরিকাতেই। অনুষ্ঠানে শিল্পী শহীদুল্লাহ ফরায়জীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার কথা বেশ ফলাও করেই জানান। এটা শুনে ভয়েস অফ আমেরিকার বাংলা বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলে ওঠেন, এতো ঘনিষ্ঠ হলে তার কাছ থেকে আপনি মাত্র দুটি গান নিলেন কেন? এর বেশি গান নিতে পারলেন না কেন? আমার তো মনে হয় অহেতুক আপনি শহীদুল্লাহ ফরায়জীর নাম ব্যবহার করছেন। এটা শুনে শিল্পী খুবই লজ্জা পান এবং ফোন করে শহীদুল্লাহ ফরায়জীকে ঘটনাটি জানান।
শহীদুল্লাহ ফরায়জীর এক বন্ধুর বোনের বিয়ে হলো অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এক বাঙালির সঙ্গে। বিয়ের পর দেশে বেড়াতে এলে বন্ধুর বোন তার স্বামীকে নিয়ে শহীদুল্লাহ ফরায়জীর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। পরিচয় পর্ব শেষে স্বামীটি জানান, শহীদুল্লাহ ফরায়জীর লেখা নষ্ট জীবন নিয়ে কী আর আমি করবো গানটি তার অসম্ভব প্রিয়। আজ এ গানের গীতিকারের সঙ্গে দেখা হওয়ায় সে অভিভূত।
গাজীপুরের জেলখানায় জুয়েল নামে এক বন্দি শহীদুল্লাহ ফরায়জীর গান গেয়ে জেলখানায় খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অন্য বন্দিরা সারাদিনই গান শোনানোর জন্য তাকে অনুরোধ করে। মাঝে-মধ্যে জেলখানার জেলারও তাকে ডেকে এনে গান শোনাতে বলে। ফলে জেলখানার ভেতর তার খাতির-যত্ন বেড়ে যায়। সম্প্রতি সে জেল থেকে মুক্তি পায় এবং শহীদুল্লাহ ফরায়জীকে ফোন করে এ ঘটনা জানায়। খুব আক্ষেপের সঙ্গে সে বলে, জেলখানাই তার ভালো ছিল, সবাই তাকে খাতির করতো, এখন তার দাম অনেক কমে গিয়েছে।
এ রকম অসংখ্য অন্ধ ভক্ত রয়েছে শহীদুল্লাহ ফরায়জীর। কুমিল্লার এক অন্ধ ভক্ত শহীদুল্লাহ ফরায়জীর লেখা অপরূপা গানটি ১০ হাজার বার শুনেছে। একটি স্থানীয় পত্রিকায় এ সংবাদটি প্রকাশিত হলে আরেক ভক্ত প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। কারণ সে শহীদুল্লাহ ফরায়জীর কেন দেখলাম তারে গানটি ৫০ হাজার বার শুনেছে। তার নাম শামীম, সে গ্রামীণফোনের কাস্টমার সার্ভিসে চাকরি করে।
ইনকাম ট্যাক্সের অতিরিক্ত কমিশনারের অফিসে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন শহীদুল্লাহ ফরায়জী। কিছুক্ষণ পর আরেক অতিরিক্ত কর কমিশনার রোকেয়া আক্তার রুবি এলেন সেখানে। শহীদুল্লাহ ফরায়জীকে একজন গীতিকার হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলে ভদ্রমহিলা বলেন, আমি বাংলা গান শুনি না। তবে একটা গান আমার অসম্ভব প্রিয় চন্দ্র সূর্য যতো বড় আমার দুঃখ তার সমান। তিনি জানতেন না যে, তার এ প্রিয় গানটির গীতিকার তার সামনেই বসে আছেন। জানার পর বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়েন তিনি।
চ্যানেল আইয়ের সেরা কণ্ঠ প্রতিযোগিতায় এক প্রতিযোগী এ গানটি গাওয়ার পর তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী রুনা লায়লা ও সাবিনা ইয়াসমিন। এ ঘটনা সরাসরি চ্যানেল আইয়ের দর্শকরা দেখেছেন এবং পরদিনের প্রায় সব পত্রিকায় সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে।
কিছুদিন আগে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন থেকে অ্যাওয়ার্ড নিয়ে বের হতেই এক ভক্ত ফোন করে হাজির হন গেটে। ভক্ত একজন ট্যাক্সিচালক। জোর করে প্রিয় গীতিকারকে তুলে নেন তার ট্যাক্সিতে এবং পৌঁছে দেন উত্তরার বাসায়। অনেক চেষ্টা করেও শহীদুল্লাহ ফরায়জী তাকে ভাড়া দিতে পারলেন না। খ্যাতিমান হয়ে খ্যাতির বিড়ম্বনায় পড়বেন না, এটা কি ভাবা যায়? তবে এর থেকেও বড় একটি বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হয়েছে মাস তিনেক আগে। শোনা যাক শহীদুল্লাহ ফরায়জীর মুখেই- চাঁদপুর থেকে এক ভক্ত এসেছে আমার বাসায়। সে আর যাবে না, আমার সঙ্গেই থাকবে। প্রয়োজনে সে আমার সব কাজ করে দেবে, তবু কাকুতি-মিনতি আমি যেন তাকে আমার বাসায় থাকতে দেই। সে নাকি বাড়ি থেকে বিদায়ও নিয়ে এসেছে। বয়স ১৭ কি ১৮। বড়লোকের ছেলে। সারাদিন ধরে তাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে অবশেষে বাড়ি পাঠিয়েছি।
এ রকম অনেক ভক্তই দেখা করতে আসেন শহীদুল্লাহ ফরায়জীর সঙ্গে। আর তাদের সবার একটাই প্রশ্ন, তিনি কেন চিরকুমার থাকলেন, কেন বিয়ে করলেন না। এ প্রসঙ্গে শহীদুল্লাহ ফরায়জী বলেন, সবার ধারণা আমি অনেক বড় কোনো আঘাত পেয়েছি, আমার জীবন দুঃখে ভরপুর। আমি যতোই বলি, আমার কোনো দুঃখ নেই, আমি একজন স্বাধীন এবং অসম্ভব সুখী মানুষ, তারা বিশ্বাস করে না। অনেকে মনে করে, গানের জন্য সংসার ত্যাগ করেছি। এটা অবশ্য কিছুটা সত্যি। এখন গানই আমার ঘর, গানই আমার সংসার। অনেকে আবার খুব সহানুভূতি প্রকাশ করে, যেহেতু আমি একা। আমার জন্য এসব সঙ্গীত পিপাসু মানুষের এই যে আবেগ, অনুভূতি, উদ্বেগ, নির্মল আন্তরিকতা, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, এটা আমার জীবনের মহত্তম পাওয়া। আমি করেছি যৎসামান্য, পেয়েছি অফুরন্ত।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, ভক্তরা যেমন শহীদুল্লাহ ফরায়জীর সঙ্গে দেখা করতে আসে, তেমনি মাঝে-মধ্যে শহীদুল্লাহ ফরায়জীও যান ভক্তদের সঙ্গে দেখা করতে। ২০-২৫ দিন আগে ছোট বোন সুধা আর কবি ও গীতিকার নার্গিস আলমগীরকে নিয়ে গাজীপুরের মৌচাকে গিয়েছেন তিনি। সেখানে একটা পরিবারের সব সদস্যই তার ভক্ত। সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে শহীদুল্লাহ ফরায়জী বলেন, আমরা সেদিন কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছিলাম, কিন্তু ঠিক করতে পারছিলাম না কোথায় যাবো। শেষে ওদের বাসায় যাই। ওরা তো আমাকে দেখে হতবাক আর আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে। ওরা তিন বোন, এক ভাই। শবনম, সালমা, সাবিনা আর রাকিব। সবাই ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। আমরা সবাই মিলে সেদিন জমিয়ে আড্ডা দেই আর হেভি খাওয়া-দাওয়া শেষে ফিরে আসি। আমার উপস্থিতি কাউকে আন্দোলিত করছে, এটা আমার ভালো লাগে। তাই মাঝে-মধ্যে এভাবে কারো উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ি।
শুধু গীতিকার হিসেবে নয়, ব্যক্তি-মানুষ হিসেবেও শহীদুল্লাহ ফরায়জীকে পছন্দ করেন, ভালোবাসেন অসংখ্য মানুষ। সর্বদা হাসি-খুশি আর প্রাণখোলা মানুষ তিনি। পৃথিবীর যাবতীয় কলহ, মানুষের সহজাত নানা কলুষতা থেকে কঠোর সাধনায় নিজেকে মুক্ত করেছেন তিনি, যার ফলে একজন নির্মল, পরিচ্ছন্ন আর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে অনেকেই তাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। শহীদুল্লাহ ফরায়জীর আদর্শে শুদ্ধ সুন্দর নির্মল হোক সব ভক্তের জীবন।
সূত্রঃ যায়যায়দিন।
Bangla Music Tags: রুনা লায়লা, শহীদুল্লাহ ফরাজী, সাবিনা ইয়াসমিনRelated posts
Bangla Music : Incoming search terms
- ফোন করে (1) -

Post Your Comments