বেহালার সুরে রূপসী
বসার ঘরে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর এলেন রূপসী। ‘কিছু মনে না করলে প্রথমবারের মতো আমার ঘরে বসেই সাক্ষাৎকারটা দিতে চাইছি’-বললেন তিনি।
খানিক বাদেই বোঝা গেল ভেতরে নিয়ে বসানোর কারণ। ‘আসছে ঈদে বাজারে আমার গানের সিডি বের হচ্ছে। তা থেকেই কয়েকটা গান শোনাব আপনাদের’-প্রাথমিক আলাপচারিতার পর বললেন নিজেই।
গানের সিডি? খটকা লাগল শুরুতেই।
নুসরাত মুমতাজ রূপসীকে সবাই চেনেন বেহালা বাজিয়ে হিসেবেই। শখের বশে শুরুটা ড্রাম বাজানো দিয়ে হলেও পরে তাঁর পড়াশোনা এই বেহালা নিয়েই। গুজরাটের বরোদার মহারাজা সায়োজি রাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্মাতক, স্মাতকোত্তর করে ডক্টরেট ডিগ্রিও নিয়েছেন শিল্পকলার ওপরই। ক্লাসিক্যাল বেহালা ছিল তাঁর বিষয়। দেশে এসে মঞ্চে বিভিন্ন পরিবেশনায় সুর দিয়ে মুগ্ধ করছেন শ্রোতাদের।
দুটো সিডিও বের হয়েছে বেহালার। তাহলে গান এল কোথা থেকে?
এখন কি নতুন করে গায়ক রূপসীকে পাব আমরা?
‘প্রথমেই বলে রাখি, গায়ক হওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। চাইলেই আমি বেহালায় যেকোনো সময় যেকোনো সুর তুলতে পারি। কিন্তু চাইলেই যেকোনো গান গাইতে পারব না।’
তাহলে গানের সিডি যে বের হচ্ছে?
‘অনেকটা জেদ করেই গান করা। তবে পেছনের তাড়না সেই বেহালাই। গান করলেও গানের ফাঁকে আমি বেহালার সুরই শুনিয়ে দেব শ্রোতাদের।’
একবার এক সাংবাদিক রূপসীকে বলেছিলেন, ‘আপনি তো শুধু এক বিশেষ শ্রেণীর শ্রোতার জন্যই বেহালা বাজান। আপনার সুর তো সাধারণ মানুষের কাছে যায় না।’ এ সমালোচনায় রাগ করেননি রূপসী বরং ভেবেছেন; বুঝেছেন, সাধারণ শ্রোতারা এখনো বেহালার সুরে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। তাই তাদের কাছে পেঁৗছাতে হলে তাদের মতো করেই পৌঁছাতে হবে।
কোনো কিছুই জোর করে করতে পারেন না তিনি। ভেতর থেকে অনুভব না করলে কোনো কাজই তাঁকে দিয়ে করানো যায় না।
লেজার ভিশন থেকে যে সিডিটি বাজারে আসবে, তাতে রয়েছে ১০টা গান। সবই তাঁর লেখা, তাঁরই গাওয়া। সুর করেছেন আলী আকতার রুনু।
তাহলে কি বলা যায়, গান গাইতে আপনার ভালোই লেগেছে?
‘এটা ঠিক, কাজগুলো করতে আমার ভালোই লেগেছে। আমার প্রতিটা কাজই থিমনির্ভর। একটা থিম গুছিয়ে আনতে অনেক সময় লাগে। কিন্তু গোছানোর পর যেই না লিখতে বসেছি, অমনি পটাপট লিখেছি গানগুলো। কিন্তু এখন লিখতে বসলে দেখি, লেখার কিছুই পাই না। মনে হয়, আমার লেখার বিষয় শেষ হয়ে গেছে। আমি তো আর জাত লিখিয়ে নই।’
এ সিডির গানগুলোর আটটিই রূপসীর নিজের জীবনের গল্প নিয়ে। সুর দিয়েই তিনি শ্রোতার সঙ্গে কথা বলেন সব সময়। এবার যুক্ত হয়েছে শব্দও। গানগুলো ঠিকমতো সাজিয়ে দিলে জীবনের ধাপগুলোও বোঝা যাবে। সাধারণভাবে শুনলে ‘শুধু তোমাকে’ নামে শিরোনামের গানটাকেই মনে হবে একটা প্রেমের গল্প। তবে আসলে গানটা রূপসীর বেহালার সঙ্গে প্রেম নিয়ে।
‘জীবনে আমি অনেকবার প্রেমে পড়েছি। প্রতিনিয়তই পড়ছি। জীবনে অনেকেই এসেছে হয়তো এই বেহালার কারণেই। আবার চলেও গেছে এর জন্যই। এই বেহালার জন্যই আমি অনেকের কাছ থেকে দূরে সরে এসেছি। তাই এর সঙ্গেই তো আমার প্রেম’-বলছিলেন রূপসী। এই গাঢ় প্রেমের গানটিও তাই কোনো হালকা প্রেমের গান নয়। শুনেই নিবিড় প্রেমের আমেজ পাওয়া যাবে।
তার আরেক প্রেম ছিল মায়ের সঙ্গে। মা আল্পনা মুমতাজ ছিলেন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী। তিন বছর আগে মা মারা যাওয়ার পর একেবারেই ভেঙে পড়েছিলেন রূপসী। মা-ই যে ছিলেন তাঁর কাছের বন্ধু। আবার মায়ের কথা ভেবেই শুরু করেছেন কাজ। ব্যস্ত হয়েছেন নিজের জগতে।
পারিবারিক ঐতিহ্য, মায়ের অবস্থান আর গুরুর শিক্ষাই তাঁর কাজের অনুপ্রেরণা। “ভালো কাজ করলে তাদের সুনাম, আর খারাপ করলে তাঁদেরই যে বদনাম হবে। আমার গুরু শ্রী নীলকান্ত নাহার ঘানেকার সব সময় বলতেন, ‘তুমি নুসরাত হইয়ো, আরেকজন ঘানেকার হইয়ো না।’ তাই আমিও সব সময় নিজস্বতা বজায় রাখতেই চেষ্টা করি।”
তাঁর ক্লাসিক্যাল গানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যান্ড গানের অভিজ্ঞতা। কলেজে পড়ার সময় এনএসবি ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। মূলত ড্রাম বাজালেও ইংরেজি গানও করতেন। এরপর ভারতে পড়াশোনা করায় ব্যান্ডে দীর্ঘ বিরতি। ফিরে এসেই রূপসী মন দেন ক্লাসিক্যাল বেহালায়। সে সময় তাঁর সুর শুনে আইয়ুব বাচ্চু বলেছিলেন, ‘এ কোন রূপসী?’
তাঁর পাশ্চাত্য ঘরানার গানের সঙ্গেই পরিচিত ছিলেন বাচ্চু। পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেন তিনি সহজেই। তাই যখন ক্লাসিক্যাল বেহালা বাজান তখন তাঁর সাজপোশাক হয় সে রকম। আর এখন ফিউশন করছেন বলে সাজপোশাকও হচ্ছে একটু অন্য রকম। তাই সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে শুরুতেই রূপসীকে দেখে একটু অবাক হতে হয়েছিল। চুলের স্টাইল, পোশাক-সবকিছুতেই নতুন এক রূপসী। সামনে যে অ্যালবামটি বাজারে আসছে তাতেও নতুন কিছুই পাবে শ্রোতারা।
সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো।
Bangla Music : Incoming search terms
- প্রেমের গান (2) - site:music.evergreenbangla.com বেহালার-সুরে-রূপসী (1) - প্রেমের গল্প (1) -

Post Your Comments