বাউল সম্রাট লালনের সমাধিতে আরবি লেখা গিলাফ
‘লালন ফকির কোনো ধর্মের অনুসারী ছিলেন না। সে পথও কাউকে দেখিয়ে যাননি। তিনি মানবতার কথা ও আত্মার মুক্তির দর্শনের মাধ্যমে মানব ধর্ম প্রচার করে গেছেন। তবে ইদানীং তাকে একটি ধর্মের দিকে নিয়ে যাওয়াকে লালন একাডেমির বিশেষ দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। প্রকৃত বাউলদের কাছে আখড়াবাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থাকলে এ ঘটনা ঘটতো না।’ কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় লালনের আখড়াবাড়িতে এসে দোল উৎসবের তৃতীয় দিনে গভীর দুঃখের সঙ্গে বললেন সামসুল ফকির। এবার আখড়ায় আসা অসংখ্য বাউল ফকির লালনের সমাধির ওপর কোরআনের একটি সুরা লেখা গিলাফ দিয়ে ঢেকে দেয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি তারা লালন একাডেমির তিন দিনের উৎসব থাকলেও শেষ দিন খুব সকালে আখড়াবাড়ি ত্যাগ করেন। রুস্তম ফকির বললেন, আমাদের মনে খুব দুঃখ। সাইজীর সমাধি একটি ধর্মের আবরণে ঢেকে দেয়া হয়েছে। তাই উৎসব শেষ হওয়ার আগেই ষোলআনা বাউল সাধুগুরুরা চলে গেছেন।
দোল উৎসবকে লালন একাডেমি স্মরণ উৎসব হিসেবে প্রচার করায় এবং আলোচনায় প্রাজ্ঞ বাউলদের না ডাকায় বাউলদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাধে। পরে গিলাফ দেয়া নিয়ে বিতর্কে বাউলরা এবারই প্রথম অনেকটা নীরবেই উৎসব শেষ না করেই বিদায় নিয়েছেন। বাউল রহমান ফকির বললেন, এটি হবেই। কারণ ২৬ বছর আগেও একবার আখড়াবাড়িতে মিলাদ দেয়া হয়েছিল। তখন বাউলদের তীব্র আন্দোলনের মুখে কর্তৃপক্ষ মিলাদ বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এর আগেও আখড়াবাড়ি থেকে বাউলদের বিতাড়িত করার নানা পায়তারা হয়েছে। এ ধারাবাহিকতা আজো রয়েই গেছে। বর্তমানে বাউলদের আখড়ায় আসা-যাওয়া একেবারে বন্ধ করা না হলেও এখানে তাদের ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে।
আখড়াবাড়ি ফিরে পাওয়ার দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বাউলরা জয়ী হলেও তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি লালন একাডেমি। এরপর ধর্ম নিরপেক্ষ লালন ফকিরকে একটি ধর্মের দিকে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন তারা। ক্ষোভে বাউলরা আখড়াবাড়ি ছেড়ে গেলেও লালনের সমাধিতে গিলাফ রেখে দেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট লালন গবেষক ও ইসলামীক ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগের প্রফেসর ডক্টর আবুল আহসান চৌধুরী তার লালন সাইয়ের সন্ধানে গ্রন্থের ৮৭ নাম্বার পৃষ্ঠায় ফতোয়ার দ্বিতীয় খণ্ডে বসন্তকুমার পালের ফকির লালন শাহ (প্রবাসী, শ্রাবণ ১৩৩২) প্রবন্ধটি উদ্ধৃত করে ছাপা মন্তব্য হুবহু তুলে ধরে বলেন, সেখানে লেখা আছে- ‘লালন সাহের জীবনী… পাঠে বোঝা যায় লালন সাহার ধর্ম্মের কোনোই ঠিক ছিল না। বরং তাহার ভাবের গান ও কবিতাবলীর ভেতর দিয়া পরিস্ফূটিত হয় যে তিনি হিন্দু জাতির একজন উদাসীন ছিলেন। তিনি কেবল মোছলমানের হস্তে অন্নব্যঞ্জনাদি ভোজন করিয়াছিলেন বলিয়াই, হিন্দু সমাজ তাহাকে সমাজচ্যুত করিয়াছিলেন। তিনি মোছলমানের অন্ন ভোজন ব্যতীত, এছলাম গ্রহণ করেন নাই, বা মোছলমান বলিয়া নিজকে স্বীকার করেন নাই বা এছলামের আকিদা, বিশ্বাস ও নামাজ, রোজা প্রভৃতির কোনো চিহ্নই কিংবা আচার ব্যবহার কিছুই তাহার মধ্যে বর্তমান ছিল না, যদ্বারা তাহাকে মোছলমান বলা যাইতে পারে, তিনি এছলামের হোলিয়া অনুসারে মোছলমানের দরবেশ ফকির হওয়া দূরে থাক, একজন মোছলমান বলিয়াও পরিগণিত হইতে পারেন না, তিনি যত বড়ই মুনি ঋষি, উদাসীন হউন না কেন, মোছলমানের তিনি কেহই নহেন। কেহ মোছলমানের অন্ন খাইয়াই মোছলমান হইতে পারে না।’ অথচ মানবতাবাদী ও ধর্ম নিরপেক্ষ বাউল সম্রাট লালন ফকিরের কবরের ওপর কোরআনের একটি সুরা লেখা গিলাফ দিয়ে মুড়িয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এবারের দোল উৎসবে এসে বাউল ভক্ত-অনুসারী ও পর্যটকরা এ নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। সবার মুখে একই কথা ছিল- কেন বাউল সাধকের কবরের ওপর একটি ধর্মের আবরণ দেয়া হলো? আখড়াবাড়ি আঙিনায় অন্য একটি কবরেও এ গিলাফ লাগানো হয়েছিল। ব্যাপক সমালোচনার মুখে লালন একাডেমি গিলাফ তুলে দেয়। কিন্তু বাউল সম্রাট লালন ও তার সঙ্গিনী মতিজান ফকিরানীর সমাধির ওপর এখনো গিলাফ রাখা হয়েছে। এতে পর্যটকরা সমাধিতে ভক্তি জানাতে এসে হোচট খাচ্ছেন। লালন অনুসারী সাধুগুরুদের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব আবদুর রব ফকির বলেন, এটি তো আসলে দোল উৎসব। লালন নিজে এ উৎসব করতেন। লালন স্মরণ উৎসব তো হয় পহেলা কার্তিক তার তিরোধান দিবসে। এবার যে ব্যক্তি এ উৎসবকে লালন স্মরণ উৎসব বলে আখ্যা দিয়েছে, তার প্রতি আমার প্রশ্ন- না জেনে সে কেন এটি করতে গেল। এতে তো লালনের ওপর কলঙ্ক দেয়া হলো।
লালন একাডেমির সদস্য সচিব ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এ কে এম আজাদুর রহমান বলেন, ওই জায়গাটা (সমাধি) বাউলদের। বাউলরাই সব কিছু করে। আমরা ফুলপ্যান্ট পরা মানুষ। ওখানে যাই না। তবে কে ওই গিলাফ সমাধিতে দিয়েছে, তা তার অজানা বলে দাবি করেছেন। উল্লেখ্য, ২২ থেকে ২৪ মার্চ লালনের আখড়াবাড়িতে দোল পূর্ণিমা উৎসব ও মেলা শেষ হয়েছে।
সূত্রঃ যায়যায়দিন।

Post Your Comments