‘বাংলা’ ব্যান্ডের বয়স এক যুগেরও বেশি। অথচ অ্যালবামের সংখ্যা মাত্র দুটি। সম্প্রতি শুরু হয়েছে ব্যান্ডের তৃতীয় অ্যালবামের কাজ।
‘বাংলা’র ছয় সদস্য অনেকের জন্য তখন দিনের শেষ হলেও, ‘বাংলা’র জন্য মাত্র দিনের শুরু। বিকেলের সেই পড়ন্ত আলোতেই একে একে জড়ো হলেন বাংলা ব্যান্ডের সব সদস্য। ঠিক সবাই নন। তখনো দেখা নেই অর্ণবের। ঢাকার বাইরে গান গাইতে গেছেন তিনি। সবাই তাঁর অপেক্ষায়। একটু পরই অর্ণব এসে ঢুকলেন। যাটজটের কারণে আসতে বেশ সময় লেগেছে তাঁর। বললেন, ‘নিজের চোখেই তো দেখলেন, ব্যান্ড আমার জন্য কত অসুবিধায় পড়ে। তার পরও আমরা খুব ভালো বন্ধু হওয়ায় কখনোই কোনো সমস্যা হয় না। সবাই ঠিক ঠিক ম্যানেজ করে নেয়। ওরা সহযোগিতা না করলে আমার একক গানের ক্যারিয়ার হয়তো এমনটা হতো না।’
গান তাঁদের কাছে যতটা না শখ, তার চেয়ে বেশি নেশা। ‘আমরা অন্যদের মতো করে গান করতে চাই না। পেশাদারি মনোভাব তো কখনোই ছিল না। নিজের মতো করে আমরা গান করি।’ বললেন বুনো। এ ব্যান্ডের বয়স প্রায় ১২ বছর। এত দিনে অ্যালবাম মাত্র দুটি। সেটা ওই ভিন্ন কিছু করার তাগিদ থেকেই। সব সময় নিজেদের ভাঙার চেষ্টা বাংলার। কিংকর্তব্যবিমূঢ় থেকে প্রত্যুত্পন্নমতিত্ব অনেক দিক থেকেই আলাদা। নতুন অ্যালবামও হবে আলাদা, ভিন্ন রকমের। কিন্তু সেই ভিন্নতা আসবে কোন দিক দিয়ে? বুনো বললেন, ‘গান ও শব্দের দিক দিয়ে। প্রথম অ্যালবামে আমরা অ্যাকুইস্টিক ব্যবহার করেছি। পরের অ্যালবামে বেশি ছিল যন্ত্রের কাজ।’ নজরুল বললেন, ‘এবার প্রচুর নতুন নতুন অ্যাকুইস্টিক ব্যবহার করব, যা আগে কখনো করিনি। তার ওপর থাকবে নতুন প্রযুক্তির ছোঁয়া। সব মিলিয়ে অন্য রকম হবে।’ তবে সবচেয়ে বড় ব্যাপার, এবারই প্রথম বেশ কয়েকটি মৌলিক গান নিয়ে আসছে বাংলা। যেটা এর আগে কোনো অ্যালবামেই ছিল না। লালনের গান থাকবে না? ‘তা কি হয়? লালন থেকেই তো আমাদের জন্ম। তবে মাত্র দুটি। এবার একটু মৌলিক গান বেশি করতে চাচ্ছি।’ বললেন আনুশেহ। ‘হিট ফর্মুলা’ নয়, নিজেদের ভাঙা-গড়ার খেলাতেই বাংলার সদস্যদের বেশি আনন্দ। বুনো বললেন, ‘আমরা তো প্রতিদিনই নতুন কিছু না কিছু শিখছি। এই কয় বছরে নতুন যা শিখেছি, সেগুলো ব্যবহার করতে চাই এ অ্যালবামে।’ জীবন বললেন, ‘আমাদের ভাগ্য ভালো, আমরা বিদেশি বিখ্যাত সব শিল্পীর সঙ্গে অনেক মেশার সুযোগ পেয়েছি। আমাদের গানের বোধকে জাগিয়ে তুলতে সেগুলো বেশি সাহায্য করছে।’
তবে নতুন অ্যালবামকে তৃতীয় অ্যালবাম নয়, ‘বাংলা’ বলছে তাদের দ্বিতীয় অ্যালবাম। সেটা কীভাবে? প্রত্যুত্পন্নমতিত্ব এভাবে শতভাগ ব্যান্ডের অ্যালবাম ছিল না। একেকজন একেক জায়গায় থেকে বাজিয়ে পরে জোড়া লাগিয়ে গান বানানো হয়েছে। ৬৩টি জেলায় একসঙ্গে বোমা হামলার প্রতিক্রিয়ায় এটা ছিল আমাদের ব্যান্ডের একটা প্রকল্প।’ জানালেন কার্তিক। সেই অভাবটা পুষিয়ে নিতেই এবার লাইভ রেকর্ডিং করছে ‘বাংলা’। আগে যেমন সবাই একসঙ্গে বসে গান গাইত, বাজাত সেভাবে রেকর্ডিং করা হচ্ছে অ্যালবামের অর্ধেক গান। আনুশেহ বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, ‘শ্রোতারা এতে দারুণ মজা পাবে বলে আমার বিশ্বাস।’
বছর দশেক আগের কথা। আর্মি স্টেডিয়ামে ‘আমি অপার হয়ে’ গাইছে বাংলা। ইংরেজি মাধ্যমে পড়া এক ছাত্রী বুনোকে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘গানের কথাগুলো অসাধারণ। কে লিখেছেন?’ বুনোর উত্তর, ‘কুষ্টিয়ার লালন সাঁই।’ ‘তাঁকে কুষ্টিয়ার কোথায় পাওয়া যাবে। আমি দেখা করতে চাই।’ বুনোর এবার ভিরমি খাওয়ার পালা। ‘তুমি তো কয়েক শত বছর দেরি করে ফেলেছ।’ এর বছরখানেক পর আবারও আর্মি স্টেডিয়ামে কনসার্ট। তবে সেদিন আর ‘আমি অপার হয়ে’ গাইতে হয়নি বাংলার। দর্শকেরাই পুরো গান গেয়েছে। বাংলা শুধু বাজিয়েছে। ‘নতুন প্রজন্মের কাছে এই যে লালনকে তাদের মতো করে পৌঁছে দিতে পেরেছি, এটাই আমাদের সার্থকতা। আমাদের গান শোনার পর লালনের অনুসারী হয়েছেন—এ রকম মানুষের কথা যখন শুনি, তখন মনটা আনন্দে ভরে যায়।’ বলছিলেন আনুশেহ। নিয়মভাঙা সেই সুরের খেলা খেলতে বাংলা এখন আবার তৈরি, নিজেদের মতো করে।
পার্থ সরকার
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারী ০৪, ২০১০
Related News:
Leave a Reply