বাংলাদেশে ভারতীয় শিল্পীদের কনসার্টে ভিডিও রাইট নিয়ে গোলযোগ সৃষ্টি একটা নিয়মিত অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। ভারতীয় শিল্পীদের সঙ্গে ভিডিও রাইটের ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো চুক্তি না করেই ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া পার্টনার হচ্ছে বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো। কিন্তু ভিডিও রাইট পেতে হলে শিল্পীদের সঙ্গে আগেই চুক্তি করে নিতে হবে। তা না করে চ্যানেলগুলো শুধু স্থানীয় ইভেন্ট ফার্ম কিংবা ইভেন্ট অর্গানাইজারদের সঙ্গে মিডিয়া পার্টনার হয়েই বিদেশি শিল্পীদের কনসার্ট ভিডিও করে এতোদিন প্রচার করে আসছিল। সম্প্রতি ভারতীয় শিল্পীদের চারটি কনসার্টে ভিডিও রাইট নিয়ে তুমুল হট্টগোল বেধে যায়। ভারতীয় শিল্পীরা ভিডিও রাইটের ব্যাপারে চ্যানেলগুলোর সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো চুক্তি না থাকায় কনসার্টের শুরুতে কিংবা মাঝখানে ভিডিও করা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। ফলে কনসার্টের শুরুতে কিংবা মাঝখানে হলভর্তি দর্শক-শ্রোতার সামনেই দৃষ্টিকটু পরিবেশের সৃষ্টি হচ্ছে।
২৬ জুন বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের হল অফ ফেমে পঙ্কজ উদাস ও ইভা রহমানের গজল নাইটে মিডিয়া পার্টনার এটিএন বাংলা অনুষ্ঠানটি ক্যামেরায় ধারণ করছিল। হঠাৎ তিন-চারটি গজল পরিবেশনের পর পঙ্কজ উদাস পরিবেশনা বন্ধ করে দেন। উপমহাদেশের খ্যাতিমান এ গজল শিল্পী মিডিয়া পার্টনার এটিএনের সব ক্যামেরা বন্ধ করার নির্দেশ দেন। এমনকি তিনি মোবাইলেও ভিডিও করতে নিষেধ করেন। পঙ্কজ উদাস বলেন, টেকনিক্যাল সমস্যা আছে। পরে দোতলা হলের উপরে-নিচে সব ক্যামেরা বন্ধ করা হলে তিনি আবার গজল পরিবেশন শুরু করেন। এ সময় মঞ্চ ও মঞ্চের আশপাশে তুমুল হইচই শোনা গেছে।
২৫ জুন র্যাডিসন ওয়াটার গার্ডেন হোটেলের উৎসব হলে জীবনমুখী বাংলা গানের মহানায়ক নচিকেতার লাইভ শোতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। হঠাৎ শো’র মাঝখানে মিডিয়া পার্টনার দেশটিভির সব ক্যামেরা বন্ধের নির্দেশ দিয়ে নচিকেতা বলেন, চুক্তি ছাড়া অনেক ভিডিও করতে দিয়েছি। কোনো কিছু ছাড়া আর ভিডিও করতে দেবো না। আমি একটা ঘরোয়া শোতে গান গাইতে এসেছি। সবাই টাকা দিয়ে শো দেখতে এসেছে। শিল্পীর সঙ্গে কোনো চুক্তি না করে চ্যানেল পুরো অনুষ্ঠান প্রচার করে দিলে ভবিষ্যতে টাকা দিয়ে কেউ আর আমার শো দেখতে আসবে না। নচিকেতা গান বন্ধ করে দেশটিভির ক্যামেরা সত্যি সত্যি বন্ধ হয়েছে কি না সেটা নিশ্চিত করে আবার গান পরিবেশন করেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আয়োজকদের কারো কারো মোবাইল বন্ধ পাওয়া গেছে আর অন্যদের খুঁজেই পাওয়া যায়নি।
২০ জুন শানের কনসার্টেও একই ঘটনা ঘটে। মিডিয়া পার্টনার এটিএন বাংলাকে পাঁচ-ছয়টি গানের পর শান আর ভিডিও করতে দেননি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শানের লাইভ কনসার্টের আয়োজক ডি-জোনের সিইও আশফাক খলিল দিপু জানান, দু’ভাবে এ ভিডিও রাইট স্বত্ব নেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো ভারতে শিল্পীর কোম্পানি বা এজেন্সির সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করে নিতে পারে। স্থানীয় ইভেন্ট ফার্মগুলোর সঙ্গে চ্যানেলগুলোর ভিডিও রাইটের ব্যাপারে কোনো চুক্তি হয় না। ১০০ ভাগ আইনসিদ্ধভাবে ভারতীয় কোনো শিল্পীর ভিডিও রাইট কেনা বাংলাদেশের কোনো চ্যানেলের পক্ষেই সম্ভব নয়। যেমন শানের ভারতীয় কোম্পানি ইএসআই বাংলাদেশে ভিডিও রাইটের ব্যাপারে কোনো অনুমতি দেয়নি। যদিও শানের এজেন্সি অনুমতি নিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। পরে তা আর সম্ভব হয়নি। শানের ভিডিও রাইট নিতে হলে কমপক্ষে ২৫ লাখ রুপি দিতে হবে, যা বাংলাদেশি কোনো চ্যানেলের পক্ষে অ্যাফোর্ড করা সম্ভব নয়।
মে মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে সুফী রক কনসার্টের একই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। ভারতের প্রখ্যাত গায়ক কৈলাস খের গান শুরুর আগেই মিডিয়া পার্টনার চ্যানেল ওয়ানের সব ক্যামেরা বন্ধের নির্দেশ দেন। ক্যামেরা বন্ধ করলে তিনি গান পরিবেশন শুরু করেন।
বিদেশি শিল্পীদের ভিডিও রাইট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইভেন্ট অর্গানাইজার ও প্রডিউসার রুবাইয়াৎ ঠাকুর রবিন বলেন, এটা খুবই যুক্তিসঙ্গত। বিদেশি শিল্পীদের সঙ্গে ভিডিও রাইটের ব্যাপারে চুক্তি না করে যে কোনো কনসার্ট ফ্রি ভিডিও করা রীতিমতো অন্যায়। কোনো লাইভ শো’র ভিডিও ধারণ করতে হলে শিল্পীকে অবশ্যই আগে থেকে তা জানাতে হবে। ভিডিও রাইটের টাকা লাইভ শো’র চেয়েও বেশি। কেউ টাকা দিয়ে টিকেট কেটে লাইভ শো উপভোগ করতে আসে। আর কেউ চ্যানেলের ফ্রি প্রচারের সুবাদে ঘরে বসে একই অনুষ্ঠান উপভোগ করবে। এ ব্যবধান সবাইকে বিবেচনা করতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশের শিল্পীরাও ভিডিও রাইটের ব্যাপারে সচেতন হচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত শিল্পী বলেন, তাই তো, যা হওয়ার তাইতো হচ্ছে এবং হবে।
আবেগ রহমান
সূত্রঃ যায়যায়দিন, জুন ২৯, ২০০৯
Tags: নচিকেতা, পঙ্কজ উদাস, শান
Related News: