গানে গানে দুই প্রজন্মের মেলবন্ধন

Posted by Bangla Music on Jan 14th, 2010 and filed under Bangla Music, Features, Photo Gallery, সঙ্গীতানুষ্ঠান. 292 views. You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0. You can leave a response or trackback to this entry

গানে গানে দুই প্রজন্মের মেলবন্ধন

গানের ফাঁকে দুই প্রজন্মের দুই শিল্পী—ভারতের দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় ও বাংলাদেশের শামা রহমান ‘তোমার হলো শুরু আমার হলো সারা’—এটাই ছিল ‘হূদয়েতে পথ কেটেছি’ অনুষ্ঠানের শেষ গান। দ্বৈত কণ্ঠে গেয়েছিলেন গত শতকে ভারতের বাংলা গানের স্বর্ণযুগের শিল্পী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় এবং এ দেশের একুশ শতকের শামা রহমান।
গত সোমবার সন্ধ্যায় জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হলো এই দুজন শিল্পীর গাওয়া রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে হূদয়েতে পথ কেটেছি অ্যালবামের প্রকাশনা। আয়োজন করেছিল বেঙ্গল ফাউন্ডেশন।
অ্যালবামটির মোড়ক খোলার জন্য আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন ড. রফিকুল ইসলাম। তিনি বললেন, ‘যাঁদের গান শুনে আমরা বড় হয়েছি, তাঁদেরই একজন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় আমাদের মাঝে এসেছেন। এর চেয়ে পরম অভিজ্ঞতা আর কী হতে পারে! আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি এ দেশের বর্তমান প্রজন্মের শিল্পী শামা রহমানের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছেন। ৮২ বছর বয়সের দ্বিজেনের যে কণ্ঠ শুনলাম, তাতে মনে হচ্ছিল, আমি সেই পঞ্চাশের দশকে ফিরে গেছি। আর শামার গান তো সব সময়ই শুনছি। এ যেন প্রকৃতপক্ষেই দুই প্রজন্মের মেলবন্ধন। এই বন্ধন চিরন্তন হোক, সার্থক হোক।’
দ্বিজেন জানান, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন থেকে তাঁর আরও দুটো অ্যালবাম বেরিয়েছে। একটি আধুনিক গানের, হাজার মনের ভিড়ে; অন্যটি রবীন্দ্রসংগীতের, পুরানো সেই দিনের কথা। এবার তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে হূদয়েতে পথ কেটেছি অ্যালবামের প্রকাশনা উপলক্ষে। এর জন্য বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়েরকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
রোববার সন্ধ্যায় আবুল খায়েরের বাসায় অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুতি নেন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় ও শামা রহমান। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন যন্ত্রীরা। মহড়া শুরুর আগে আলাদা করে পাওয়া গেল এই দুজন শিল্পীকে। সেখানে আরও ছিলেন আবুল খায়ের ও দ্বিজেনের সঙ্গে কলকাতা থেকে আসা তবলিয়া দীপঙ্কর।
আড্ডার শুরুতেই দ্বিজেন জানান, ২৫ বছর পর ঢাকায় এসেছেন তিনি। শেষ এসেছিলেন ভারতের শিল্পমেলা উপলক্ষে। সেখানে তিনি একটানা আড়াই ঘণ্টা গান করেছিলেন।
এবার বাংলাদেশে আসার অভিজ্ঞতার কথা বললেন এভাবে, ‘ঢাকার এ কী অবস্থা! চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ! আর কয়দিন পর তো রাস্তায় হাঁটার জন্য এতটুকু জায়গা পাওয়া যাবে না। এত জ্যাম! কারও সঙ্গে অ্যাপয়েনমেন্ট ঠিক রাখাই মুশকিল হয়ে যাবে।’
এরপর সরাসরি গানের প্রসঙ্গ। বাংলাদেশে রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা নিয়ে উচ্ছ্বসিত দ্বিজেন। বললেন, ‘আমাদের ওখানে এখন রবীন্দ্রসংগীতকে নিয়ে নিরীক্ষার নামে যে যেভাবে পারছে, করে যাচ্ছে। কেউ তাদের ডাক দেয় না। এটাও ঠিক, মানুষ কিন্তু এগুলো নিচ্ছে না। দুয়েকবার শুনছে, আলোচনা করছে, সমালোচনা হচ্ছে। এরপর কিন্তু আবার সেই মূল গানের কাছেই ফিরে যাচ্ছে।’
শামা বললেন, ‘আমাদের এখানে রবীন্দ্রনাথের গান মানেই সবার প্রাণের গান। সংগীত আয়োজনে আধুনিক সব যন্ত্র যুক্ত হচ্ছে, নতুনত্ব এসেছে; কিন্তু এই গান নিয়ে নিরীক্ষার নামে খুব একটা বাড়াবাড়ি দেখা যায় না।’
দ্বিজেনের গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত ‘ওই জানালার কাছে বসে’ শামার খুব পছন্দ। দ্বিজেন বললেন, ‘গানটি নিয়ে মজার ঘটনা আছে। গানটি একতালের। কিন্তু রেকর্ডে আমি ভুল করে তা দাদরা তালে করেছি। একতাল ১২ মাত্রা আর দাদরা ছয়। বিশ্বভারতী থেকে অনুমোদনও পাওয়া গেল। ব্যাপারটা কেউ ধরতেই পারেনি। গানটা তখন খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। কিন্তু আমার মধ্যে কিছু অনুশোচনা কাজ করছিল। তাই ২০ বছর পর গানটা আবার নতুন করে একতালে রেকর্ড করি।’ শান্তিদেব ঘোষ জিজ্ঞেস করলেন, গানটা তো ভালোই ছিল, আবার নতুন করে গাইলে কেন? ব্যাপারটা তাঁকে জানাতেই বললেন, ‘এটা তো তুমি বেশ দারুণ কাজ করেছ। দাদরাতে শুনতে ভালোই লেগেছে। তবে এটা কিন্তু আর কাউকে বলো না।’
সে যুগেও রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে নানা ধরনের নিরীক্ষা হয়েছে। দ্বিজেন জানান, ক্ষুধিত পাষাণ ছবিতে তিনি গান করেছিলেন ওস্তাদ আমির খানের সঙ্গে। ছবিতে তিনি ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’ গানটি গেয়েছি আর বাগেশ্রী রাগে আলাপ ও বিস্তার করেছেন আমির খান। বললেন, সেখানে একটি শৈল্পিক ব্যাপার ছিল, গান নিয়ে কোনো নোংরামি হয়নি। রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর গানকে পরিপূর্ণ রূপ দিয়ে গেছেন। কারও জন্য কিছু রেখে যাননি।
পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গানে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের বেশ সুনাম। কিন্তু তাঁর ইচ্ছা রবীন্দ্রসংগীতের দিকে। বললেন, তখন হাতে গোনা কয়েকজন রবীন্দ্রসংগীতকে একান্ত নিজেদের করে রাখতে চেয়েছিলেন। আর কেউ এই গান করুক, এটা তাঁরা চাননি। আমরা কয়জন তাঁদের এই ইচ্ছাকে ভেঙে দিই। এর জন্য যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। আধুনিক গানের শিল্পী বলে তাঁরা কখনই আমাদের সুযোগ দিতে চাননি। তবে আমরা প্রমাণ করেছি, যে আধুনিক গান করে, সে সব ধরনের গানই করতে পারে। আর দুই ক্ষেত্রেই সফল হওয়া সম্ভব। তবে ব্যতিক্রম যে হয়নি, তাও নয়। শ্যামল মিত্রকে দিয়ে গাওয়ানোর চেষ্টা করেছিল গ্রামোফোন কোম্পানি। কিন্তু সফল হয়নি। আবার সব রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীকে দিয়ে কিন্তু আধুনিক গান করানো যায়নি। এই যেমন সাগর সেন ও চিন্ময় আধুনিক গানে সফল হতে পারেননি। তাঁদের রবীন্দ্রসংগীত নিয়েই থাকতে হয়েছে।
পরদিন সন্ধ্যায় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনটি ভরে গিয়েছিল কানায় কানায়। সবাই এসেছিলেন দুই প্রজন্মের এই দুজন শিল্পীর গান শোনার জন্য। তবে সবার আকর্ষণটা যে দ্বিজেনের দিকেই বেশি ছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অনুষ্ঠানের শুরুতেই এই দুজন শিল্পী দ্বৈত কণ্ঠে শোনালেন তিনটি গান। অনুষ্ঠানের শুরু হয়েছিল, ‘আমি হূদয়েতে পথ কেটেছি’ গান দিয়ে। এরপর শামা শোনালেন আটটি গান। দ্বিজেন তাঁর পরিবেশনা শুরু করেন, ‘কান্না হাসির দোল দোলানো’ গান দিয়ে। একটানা গাইলেন রবীন্দ্রসংগীতের পূজা, প্রেম, প্রকৃতি ও বিচিত্র পর্যায়ের ১৬টি গান। রবীন্দ্রসংগীত তো শোনা হলো, মিলনায়তনের সব শ্রোতার মনে দ্বিজেনের কণ্ঠে আধুনিক গান শোনার ইচ্ছা।
শিল্পী কাউকেই নিরাশ করেননি। নিজের কণ্ঠে জনপ্রিয় হওয়া অনেক গানের মধ্য থেকে আটটি শোনালেন। শুরুটা করেছিলেন অভিজিত্ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সাতনড়ির হার দিব’ দিয়ে, আর তাঁর শেষ গান ছিল সলিল চৌধুরীর সুরে ‘পল্লবী গো সঞ্চারিণী’।
অনুষ্ঠানের শেষে আবুল খায়ের জানালেন, বুধবার দ্বিজেন গান করবেন ঢাকা ক্লাবে আর শুক্রবার তাঁর বাসায় এক ঘরোয়া আসরে।

মেহেদী মাসুদ
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জানুয়ারী ১৪, ২০১০

Tags: , ,

Related News:

Leave a Reply

Login with Facebook:

Bangla Music : Incoming search terms

cache:HObEVjfxGAoJ:music.evergreenbangla.com/ Bangladeshi Film Song download (1) - যে রাতে মোর download song (1) - গানে গানে (1) - বাগেশ্রী রাগে রবীন্দ্রসংগীত (1) -
Advertisement