গানের জগতের দুই কাণ্ডারি বারী সিদ্দিকী ও শহীদুল্লাহ ফরায়জী
ফোকের সঙ্গে ইনডিয়ান ক্লাসিকালের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে বাংলা গানে ভিন্ন ধারার উপস্থাপনার মাধ্যমে সব শ্রেণীর শ্রোতার কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন বারী সিদ্দিকী। অন্যদিকে হাছন রাজা, লালন ফকির, আবদুল করিমের মতো অনেকের হাতে প্রাণ পাওয়া দর্শন নির্ভর আধ্যাত্মিক ও দেহতাত্ত্বিক গানের ধারাটাকে মর্ডানাইজ করে গানের কথায় নতুনত্ব এনেছেন শহীদুল্লাহ ফরায়জী। গানকে শিল্প হিসেবে উপস্থাপনার ভিত্তি থেকে ভাবতে গিয়ে চিন্তার জগতে এ দুজনের পছন্দ-অপছন্দ, ভালো লাগা-মন্দ লাগা, সর্বোপরি দুজনের রুচিবোধ প্রায় একই রকম হওয়ায় এ দুজন দীর্ঘদিন ধরে গানের জগতে একসঙ্গে কাজ করছেন। সম্প্রতি যায়যায়দিনের চে কাফেতে এসে গান এবং অন্যান্য প্রসঙ্গে তুমুল আড্ডায় মেতেছেন সঙ্গীত অঙ্গনের এ চমৎকার জুটি। যায়যায়দিন পাঠকদের জন্য আড্ডার চুম্বক অংশ তুলে এনেছেন টি আই অন্তর ও ছবি তুলেছেন শরীফ সারওয়ার।
গানের জগতে আপনাদের দুজনকে এখন জুটি হিসেবে দেখছেন অনেকে, বিষয়টিকে কিভাবে নিচ্ছেন?
বারী সিদ্দিকী : এটা আমাদের জন্য আশার কথা। কারণ আমাদের জুটি হিসেবে ভাবা মানে মানুষ আমাদের গান পছন্দ করছে, আমাদের চিন্তা-চেতনা, আমাদের ধ্যান-ধারণা দ্বারা সংক্রমিত হচ্ছে।
শহীদুল্লাহ ফরায়জী : আমাদের গান আমাদের চিন্তা-চেতনারই প্রতিফলন।
বারী সিদ্দিকী : অনেক রকম গানের ভিড়ে আমাদের গান যে মানুষ আলাদা করে দেখছে, এটা তো অন্যরকম একটা ভালো লাগার ব্যাপার।
শহীদুল্লাহ ফরায়জী : তাছাড়া এটা সঙ্গীত অঙ্গনের জন্য পজিটিভও। কেননা জুটি বেধে গান করলে গানের মান ভালো হয়। যেহেতু এ ক্ষেত্রে দুজনের মধ্যে ভালো বোঝা-পড়া থাকে, তাই একজন আরেক জনকে পরামর্শ দিয়ে সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে পারেন।
বারী সিদ্দিকী : আরেকটা বিষয় হচ্ছে, একটা সৃষ্টিশীল গানের জন্য গীতিকার-সুরকার ও শিল্পীর সঙ্গে খুব ভালো সমন্বয় থাকা দরকার। একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে যেটা আমরা পেয়েছি।
এভাবে একসঙ্গে গান করার শুরুটা হয় কখন, কিভাবে?
বারী সিদ্দিকী : এটা সম্ভবত ১৯৯৭-৯৮ সালের কথা। ফরায়জীর একটা অ্যালবামে আমি দুটি গান করি। হায়রে আমার সারা দেহ ডুইবা রইলো এবং তুমি আমার কেমন বন্ধু হলে।
শহীদুল্লাহ ফরায়জী : অ্যালবামের নাম প্রেমের শরীর। রবি চৌধুরী, এস ডি রুবেল, ডলি সায়ন্তনী ও বারী ভাইকে নিয়ে আমার কথায় এ মিক্সড অ্যালবামটি করি। গান গাওয়া ছাড়াও বারী ভাই এ অ্যালবামে তিনটি গানের সুর করেছেন। সেই প্রথম আমি বারী ভাইকে অন্যভাবে আবিষ্কার করি। একেবারে অন্য রকম সুর, অন্য রকম গায়কী।
বারী সিদ্দিকী : এ অ্যালবাম করতে গিয়ে আমরা দুজনই উপলব্ধি করি যে, আমাদের দুজনের মিউজিক টেস্ট এক রকম। ব্যস, শুরু করলাম একসঙ্গে কাজ।
শহীদুল্লাহ ফরায়জী : এরপরই বারী ভাইয়ের দুঃখ রইলো মনে শিরোনামের প্রথম একক অ্যালবামটি করি। এ অ্যালবামের সব গানই আমার লেখা আর বারী ভাইয়ের সুর করা। এরপর আমরা একসঙ্গে অনেক কাজ করেছি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আসিফ, মনির খান ও বারী ভাইয়ের মিক্সড অ্যালবাম কথা রটেছে। আসিফ ও বারী ভাইয়ের দ্বৈত অ্যালবাম ভালোবাসতেও দিলি না। নোলকের একক অ্যালবাম নিজের কাধে নিজে। বারী ভাইয়ের একক অ্যালবাম মাটির মালিকানা, অপরাধী হইলেও আমি তোর, নিলুয়া বাতাস, মাটির মালিকানা, ভাবের দেশে প্রভৃতি।
বারী সিদ্দিকী : অডিও ছাড়া নাটক এবং মুভিতেও আমাদের দুজনের কিছু কাজ রয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য দেবদাস টেলিফিল্ম এবং রূপকথার গল্প মুভি। ফরায়জীর কথায় আর আমার সুরে দেবদাসে পাচটি গান এবং রূপকথার গল্পে দুটি। দেবদাসের গানগুলো গেয়েছেন রুনা লায়লা, বেবী নাজনীন, আসিফ, এন্ড্রু কিশোর ও আমি। আর রূপকথার গল্পের দুটি গান আমিই গেয়েছি।
যে ধারার গানে আপনাদের মন একই ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে, সে ধারাটা সম্পর্কে বিস্তারিত বলুন।
বারী সিদ্দিকী : বিস্তারিত বলতে গেলে একটু পেছনে ফেরা দরকার। ভারতবর্ষ থেকে আসার পরই আমি গান গাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। কারণ ওখানে আমি নর্থ ইনডিয়ান ক্লাসিকাল মিউজিকের সঙ্গে একটা দীর্ঘ সময় ব্যয় করি। এ ধারার অনেক গুণী শিল্পী ও সঙ্গীত পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য হয় আমার। এ ধরনের মিউজিকের সঙ্গে আমার একটা আত্মিক সম্পর্কও গড়ে ওঠে। কিন্তু আমার ভেতরে গাছ-পালার মতো বেড়ে উঠেছে এবং খুব শক্তভাবে শেকড় গেড়ে আছে বাংলা ফোক গান। নিজে গান গাওয়ার কথা যখন ভাবছিলাম, তখন একদিকে আমাকে ফোক গান খুব টানছিল, অন্যদিকে ক্লাসিকের প্রতি সদ্য গড়ে ওঠা ভালোবাসাও আমাকে খুব হাতছানি দিচ্ছিল। দেশে ফিরে চিন্তা করি, ফোক মিউজিকের সঙ্গে ক্লাসিক মিউজিক পান্স করলে কেমন হয়। এ চিন্তা থেকে আমি কিছু নিরীক্ষাধর্মী গান করি। হুমায়ূন আহমেদের ৪৫তম জন্মদিনে তার বাসায় সবার অনুরোধে কয়েকটি গান শোনাই। উপস্থিত সবাই বিশেষ করে অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর, ভারত বিচিত্রার বেলাল ভাই, বিটিভির মোস্তাফিজুর রহমান উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন এবং এ ধরনের গানের জন্য ভীষণ উৎসাহিত করেন। তারপর হুমায়ূন আহমেদ তার শ্রাবণ মেঘের দিন মুভিতে আমাকে দিয়ে দুটি গান করান। আমার মনে যতো দুঃখ সয় এবং সুয়া চান পাখি গান দুটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। তারপর ফরায়জী আর আমি মিলে এ ধারার বহু গান করেছি। শ্রোতারা নতুন স্বাদ পাচ্ছে, মিডিয়ায় আসছে। আমরাও প্রতিনিয়ত শিখছি, ভালো থেকে আরো ভালো কিছু দেয়ার চেষ্টা করছি। সবার পরামর্শ নিচ্ছি। সেভাবেই আগামীর জন্য নিজেদের তৈরি করছি।
শহীদুল্লাহ ফরায়জী : আমরা আসলে যে ধারার গান করছি এটাই গানের বেসিক ধারা। এ ধারাটা বাংলা গানের জন্য একেবারেই নতুন উপস্থাপনা। যার কারণে গানগুলো শ্রোতাদের টাচ করছে। আমাদেরও একটা ভিত্তি দাড়িয়ে গিয়েছে। ভক্ত-শ্রোতারা চিঠি লিখে, ফোন করে তাদের ভালো লাগা-মন্দ লাগার বিষয়ও জানাচ্ছেন, আমাদের দুর্বলতাও ধরিয়ে দিচ্ছেন। খেয়াল করলাম, গানে এখন কথার গুরুত্বও অনেক বেড়ে গেছে। কথা দিয়ে আমরা মানুষের চেতনায় আঘাত করতে পারছি। আমাদের গান শরীর দোলানোর জন্য নয়, মনকে দোলানোর জন্য।
বারী সিদ্দিকী : কথা ভালো না হলে কোনো গানই মানুষকে টাচ করতে পারে না। কথা হচ্ছে একটা গানের মূল প্রাণ। আমাদের গানের কথায় কোনো না কোনো মেসেজ থাকে, ফিলসফিকাল এলিমেন্ট থাকে। কিছু জিনিস আছে জানা যাবে না। কিছু জিনিস আছে পাচমিশালী রান্নার মতো। এখান থেকে যদি প্রতিটি জিনিসকে আলাদা করে রান্না করা হয়, তাহলে যেমন হবে আর কি। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি, ফোকের মধ্যে সব আছে, আমাদের কাজ হচ্ছে সঠিক নির্বাচন।
শহীদুল্লাহ ফরায়জী : ঝিনুক থেকে যেমন মুক্তো।
ফোক নিয়ে এ পর্যন্ত অনেকেই কাজ করেছেন। আপনাদের কাজ আর অন্যদের কাজের মধ্যে কেমন পার্থক্য লক্ষ্য করছেন?
বারী সিদ্দিকী : ফোক নিয়ে যারাই কাজ করছে, প্রত্যেকের কাজই প্রশংসনীয়। তবে লক্ষ্য করেছি, যারা ফোক গান করছেন, তাদের মধ্যে কোথায় যেন একটা অসততা রয়েছে। মানসিকতার জটিলতা রয়েছে। কখনো কখনো আমার মনে হয়, ওরা গানকে উপস্থাপনার চেয়ে নিজেকে উপস্থাপনা করার জন্যই যেন বেশি ব্যতিব্যস্ত। মূল উদ্দেশ্য তাই আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
শহীদুল্লাহ ফরায়জী : গান-বাজনাকে আমরা এক ধরনের সামাজিক দায় হিসেবে দেখছি। বিদ্যমান সমাজে চেতনার আলো ফেলার জন্যই তো গান। মানুষকে সমৃদ্ধ করার জন্যই তো গান। সেটাই যদি না হয়, তবে মূল উদ্দেশ্য তো ব্যর্থ হবেই। একটা গান নিয়ে আমরা অনেক সময় নষ্ট করি। একটা মানুষ হয়তো এক হাজার গান লিখলো বা গাইলো, তার মূলত দরকার একটা গান, যা তাকে এক হাজার বছর বাচিয়ে রাখবে।
আপনাদের করা গানগুলো থেকে কি ভবিষ্যতে এ রকম কোনো গান বেরিয়ে আসবে, যা এক হাজার বছর বাচার সম্ভাবনা রয়েছে।
বারী সিদ্দিকী : এটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। শিল্প-সাহিত্যের যে কোনো শাখাই ভবিষ্যতের জন্য। এটাও ভবিষ্যতের ওপরই নির্ভর করছে। আমরা কেবল বলতে পারি, আমরা ফেয়ার কিছু করছি। নট ব্যাড নট গুড, বাট উই আর ডুয়িং সামথিং ফেয়ার।
শহীদুল্লাহ ফরায়জী : আমি বলবো, বারী ভাইয়ের গান অন্তত এক হাজার বছর না হোক, দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ সময় টিকে থাকার সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। এটা বোঝার জন্য দীর্ঘ সময় আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
সবশেষে বলুন বর্তমানে আপনারা দুজন দ্বৈতভাবে কি কি কাজ করছেন?
শহীদুল্লাহ ফরায়জী : আমার কথা আর বারী ভাইয়ের সুরে বারী ভাইয়ের পরবর্তী একক অ্যালবামের কাজ করছি। এছাড়া ছোট আরো কিছু কাজ রয়েছে, সেগুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
সূত্রঃ যায়যায়দিন।
Bangla Music Tags: Bari Siddiqui, Shahidullah Faraji, বারী সিদ্দিকী, শহীদুল্লাহ ফরাজী
Post Your Comments