ক্লোজআপ ওয়ান প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত আয়োজন কেন বর্জন করেছিলেন তিন বিচারক

ক্লোজআপ ওয়ান প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত আসর বর্জন করেছিলেন তিন মূল বিচারক-আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, কুমার বিশ্বজিত ও ফাহমিদা নবী। কী হয়েছিল সেদিন? কেন তাঁরা বর্জন করেছিলেন সেদিনের অনুষ্ঠান? ৮ জানুয়ারি প্রথম আলোতে এসে তিন বিচারক জানালেন তাঁদের অভিযোগের কথা। লিখেছেন মাসুম অপু।

গত ২৯ ডিসেম্বর ন্যাম সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত হয়েছিল ক্লোজআপ ওয়ান প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার অনুষ্ঠান। প্রতিযোগিতার তিন মূল বিচারক ওই অনুষ্ঠানের মাঝামাঝি সময়ে হাজির হয়েছিলেন এবং কিছুক্ষণ অবস্থান করে তাঁরা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিচারকেরা প্রতিবাদস্বরূপ সরাসরি ধারণকৃত ওই অনুষ্ঠানটি বর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে তাঁরা বিভিন্ন পত্রিকায় লিখিত প্রতিবাদও পাঠান।

৮ জানুয়ারি প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন তাঁরা। প্রসঙ্গক্রমে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল বলেন, ‘বরাবরই আমি এ ধরনের অনুষ্ঠানের পক্ষে। কেননা আমি বিশ্বাস করি, এ অনুষ্ঠানের ফলে দেশ-বিদেশে বাংলাভাষীদের মধ্যে বাংলা গানের প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।’ কথা প্রসঙ্গে প্রথমবার আয়োজিত এই প্রতিযোগিতার কথা তুলে আনেন বুলবুল। তিনি বলেন, ‘প্রথম বছর কুমার বিশ্বজিত আমাকে যখন এ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানায় তখন সঙ্গে সঙ্গে আমি রাজি হয়ে যাই। পরে এশিয়াটিকের প্রতিনিধিরা আমাকে পুরো অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা জানান। আমরা শুরু করেছিলাম স্বতঃস্কূর্তভাবে। প্রথমবারের মতো হলেও বেশ সাজানো-গোছানো ছিল সেবার। কিন্তু দ্বিতীয়বারের আয়োজনে ছিল নানারকম অনিয়ম। দেখা গেছে, আমরা অনুষ্ঠানস্থলে হাজির, প্রতিযোগীরাও হাজির, কিন্তু অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কোনো খবর নেই। দিনের পর দিন এমন হয়েছে। হয়তো কোনো প্রতিযোগীকে বলা হয়েছে, তোমার পরীক্ষা আটটায়। ছেলেটি বা মেয়েটি সাতটা থেকে এসে বসে আছে। সারা দিন না খেয়ে রয়েছে। তার ডাক পড়ল শেষ বিকেলে। তখন তার কণ্ঠ থেকে কী গান বের হবে?’ আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রায়ই বিভিন্নভাবে আগে ধারণকৃত অনুষ্ঠান সম্পাদনা টেবিলে এমনভাবে কাটাছেঁড়া করা হতো যে, আমরা একজন প্রতিযোগীর উদ্দেশে যে কথা÷লো বলেছি, তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্পাদনা করে বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই হয়েছে। এটা আমাদের এক ধরনের অপমান করার শামিল।’

তিনি সর্বশেষ দেশাত্মবোধক গানের পর্ব থেকে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্ত্রী মিলি রহমানের বক্তব্য কাটা হয়েছে উল্লেখ করে বলেন, ‘আমাদের স্মৃতিসৌধের সাত স্তম্ভের এক স্তম্ভ একজন বীর শ্রেষ্ঠ। তাঁর স্ত্রীকে ডেকে এনে অপমান করার কোনো মানে নেই। বিষয়টি আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছে।’

কুমার বিশ্বজিত বলেন, ‘আসলে যিনি এই অনুষ্ঠান নির্মাণের পেছনে ছিলেন, তাঁর দায়িত্বহীনতার কারণে অনেক মেধাবী প্রতিযোগী এই প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ আমি বলব, আমাদের উপস্থাপনায় প্রতিযোগীর উদ্দেশে এমন কিছু মন্তব্য ছিল, যেটা তার প্রাপ্য যোগ্যতার সহায়ক হিসেবে কাজ করত। কিন্তু অনুষ্ঠান প্রযোজকের কাঁচির আধিপত্যবাদ সেটাকে খর্ব করেছে। এ ধরনের প্রতিযোগিতায় বিচারকের মতামতের ওপর দর্শক রায়ের প্রতিফলনই ঘটে বেশি। একটি অনুষ্ঠান নির্মাণের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো এর সময় এবং বিষয়বস্তুটাকে সমন্বয় করে উপস্থাপন করা। আমি এক শ ভাগ নিশ্চিত, এই সমন্বয়টা যদি এবার সঠিকভাবে হতো, তবে এর গ্রহণযোগ্যতা এবং দর্শকপ্রিয়তা বর্তমানের চাইতে আরও দ্বিগুণ হতো।’

ফাহমিদা নবী বলেন, ‘আমরা কখনো জটিলতার মধ্যে যেতে চাইনি। চেয়েছিলাম সত্যিকার অর্থে একজন ভালো শিল্পী তুলে আনতে। কিন্তু আমাদের সদিচ্ছাকে ব্যাহত করেছে তাঁদের ভূমিকা।’ এ ব্যাপারে তিনি বেড়ায় এই প্রতিযোগিতা চলাকালীন ঘটে যাওয়া একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, আমাদের সর্বাত্মক সমর্থন ছিল বলে সেদিন বেড়ায় এই প্রতিযোগিতার শুটিং ধারণ করা সম্ভব হয়েছে।’
পছন্দের প্রতিযোগী বিজয়ী না হওয়ায় তাঁরা নাকি চূড়ান্ত অনুষ্ঠান বর্জন করেছেন-একটি পত্রিকায় প্রকাশিত এনটিভির একজন কর্মকর্তার এমন ব্যাখ্যা বড়ই হাস্যকর বলে মন্তব্য করেছেন তিন বিচারক। কুমার বিশ্বজিত বলেন, ‘আমরা যা নম্বর দেওয়ার তা দিয়ে দিয়েছি। কাজেই এ ধরনের অপপ্রচারের ভিত্তি নেই।’

বিষয়টিকে দুঃখজনক উল্লেখ করে ফাহমিদা বলেন, ‘আমরা অনেক যাচাই-বাছাই করে তিনজনকে এ অবস্থানে এনেছি। আমাদের ইচ্ছে ছিল চূড়ান্ত আয়োজনে উপস্থিত থেকে প্রতিযোগীদের আশীর্বাদ করার। কিন্তু আমাদের অনিচ্ছাকৃত অনুপস্থিতির ব্যাপারে এ ধরনের অপপ্রচার দুঃখজনক।’

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল জানান, ‘দীর্ঘ সাত মাস আমরা বিচারকার্য করেছি। অথচ চূড়ান্ত অনুষ্ঠানের শুধু আমন্ত্রণপত্র পাঠানো ছাড়া আমাদের আর কোনো কিছু জানানো হয়নি।’ বি্নয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘অনুষ্ঠানের আগে এনটিভি থেকে আমাকে ফোন করে জানানো হয় চূড়ান্ত অনুষ্ঠানের জন্য আমার মন্তব্য আগে রেকর্ড করে নেবে। কিন্তু সরাসরি প্রচারিত অনুষ্ঠানে ধারণকৃত মন্তব্য দেওয়ার ব্যাপারটি আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়েছে। তাই এহেন হাস্যকর মন্তব্য প্রদান থেকে আমরা বিরত ছিলাম।’ কুমার বিশ্বজিত বলেন, ‘সব অপমান আর কষ্ট বুকে চেপে আমরা গিয়েছিলাম আমাদের হাত ধরে আসা প্রতিযোগীদের জন্য আশীর্বাদ করতে। কিন্তু অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে দেখলাম আমাদের জন্য কোনো আসনও রাখা হয়নি। বিষয়টি আমাদের জন্য রীতিমতো অপমানজনক।’

ক্লোজআপ ওয়ান প্রচারের সময় তিন বিচারকের মন্তব্য নিয়ে দর্শক মহলে নানা রকম প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কুমার বিশ্বজিত বলেন, ‘আসলে বিভিন্ন সময়ে আমাদের করা মন্তব্যগুলো বিচ্ছিন্নভাবে সম্পাদনা করা হতো। দেখা যেত এমন একপর্যায়ে শেষ করে প্রচার করা হয়েছে, যা দর্শকের কাছে ভিন্ন অর্থ তৈরি করেছে। এ ব্যাপারে অনুষ্ঠান প্রযোজকের উদাসীনতাকে দায়ী করে তিনি বলেন, আমরা অনুষ্ঠানের স্বার্থে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছি। কেননা শেষ পর্যন্ত আমরা চেয়েছিলাম ইউনিলিভারের এ মহতী উদ্যোগ সফল হোক। সব শ্রেণীর দর্শকের কাছে এ অনুষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করার ব্যাপারে আমাদের বিরাট ভূমিকা ছিল। কোন শিল্পী কী গান গাইবে, সে গানগুলোর সংগীতায়োজন কারা করবেন, সেগুলোও আমরা দায়িত্ব নিয়েছিলাম।’

ফাহমিদা নবী বলেন, আমরা একটি পরিবারের মতো ছিলাম। যে পরিবারের একটি অংশ প্রতিযোগীরা। বুলবুল ভাই একজন প্রতিযোগীর ক্ষেত্রে পিতার মতো, বিশ্বজিত দা ভাই এবং আমি বোনের মতো প্রতিযোগীদের গান শেষে মন্তব্য করেছি বলে একেকজনের মতামত একেক রকম হয়েছে।

তিন বিচারকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে এনটিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনায়েতুর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, অনুষ্ঠানটি আমাদের একার নয়। এখানে ইউনিলিভার এবং এশিয়াটিকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এর পর আমি বলব, অনুষ্ঠানের স্বার্থে একজন প্রযোজক যা ইচ্ছে তা করতে পারেন। বিচারকেরা এমন অভিযোগ করছেন কেন বুঝতে পারছি না। কারণ গানের অনুষ্ঠানে শুধু গানই প্রাধান্য পাবে। কোনো প্রতিযোগীর সঙ্গে আমাদের আলাদা কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে কেন আমরা কারও পক্ষে যাব। আর সর্বোপরি আমি বলব, এই প্রতিযোগিতার জন্য বিচারকদের একটা সম্মানী দেওয়া হয়েছে। তাঁরা স্বেচ্ছায় এখানে অংশগ্রহণ করেননি যে এ নিয়ে তাঁদের এত মাথাব্যথা থাকবে।

এ ব্যাপারে ‘ক্লোজআপ ওয়ান তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানের প্রযোজক তানভীর খান বলেন, ‘এনটিভি শুধু এ অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনারই নয়, এর ২৫% অর্থলগ্নিও করেছে। আমরা প্রতিটি অনুষ্ঠান বানিয়ে আয়োজক ইউনিলিভারের প্রতিনিধিকে দেখাই। তাঁরা অনুমতি দিলেই আমরা প্রচার করি। আর আমাদের অনুষ্ঠানের ব্যাপ্তিকাল ছিল ৪৫ মিনিট। এ সময়ের মধ্যে আমাদের সবকিছুই দেখানো সম্ভব নয়। আমরা দেখাতে পারি না কারও ব্যক্তিগত আবেগ। এ ক্ষেত্রে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের কথা আমি বলব। নানা সময়ে তিনি বিভিন্ন আবেগময় মন্তব্য করে প্রতিযোগীকে প্রভাবিত করতেন। তা ছাড়া বিচারকেরা প্রায়ই আমাদের রেকর্ডিং অনুষ্ঠানে অনেক দেরি করে আসতেন। রূপসজ্জার কাজেও কারও কারও অনেক সময় ব্যয় হতো। কেউ কেউ অনুষ্ঠান চলাকালীন ব্যক্তিগত কাজে বিদেশ সফরেও যাওয়ার নজির রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘চূড়ান্ত অনুষ্ঠানের দিন বিচারকদের দুজন একটি কনসার্টে অংশগ্রহণ করে তারপর এই অনুষ্ঠানে এসেছেন। তাঁদের জন্য সামনের সারিতেই সংরক্ষিত আসন ছিল। কিন্তু যেহেতু অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছিল তাই দেরিতে অনুষ্ঠানস্থলে ঢোকায় আমরা তাঁদের ওই আসনে বসার ব্যবস্থা করতে পারিনি।’

তবে মাসের পর মাস ধরে বিচারকদের চুলচেরা বিচারকার্য এবং পরবর্তীতে দর্শকদের ভোটে একজন প্রতিভাবান ‘সাধারণ’ সালমা যখন ক্লোজআপ ওয়ান হয়ে ওঠেন, তখন চূড়ান্ত অনুষ্ঠানে সম্মানীত বিচারকদের সরব উপস্থিতি না থাকাটা দর্শকমনে প্রশ্নই রেখে দেয়।

উত্সঃ দৈনিক প্রথম আলো

Bangla Music Tags: , , , , , ,

Related posts

Post Your Comments

*
To prove you're a person (not a spam script), type the security text shown in the picture. Click here to regenerate some new text.
Click to hear an audio file of the anti-spam word

Bangla Music : Incoming search terms