কোনো দিন কফি হাউসে যাইনি - মান্না দে
‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’-্নৃতিজাগানিয়া এই গানেই বাঙালি চেনে উপমহাদেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মান্না দে’কে। কিন্তু যেই কফি হাউস নিয়ে এই গান সেখানেই নাকি জীবনে কখনো যাওয়া হয়ে ওঠেনি তাঁর।
প্রথম আলোর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে কথাগুলো বলছিলেন মান্না দে। তিনি বলেন, ‘কফি হাউস আমার বাড়ির খুব কাছেই ছিল। কিন্তু যে কেউ জানলে অবাক হবে, আমি আজ পর্যন্ত কোনো দিন কফি হাউসে যাইনি। তবে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে কফি হাউসের যে ছবিটা গীতিকার গৌরী প্রসন্ন মজুমদার গীতিকবিতায় তুলে ধরেছেন, সেটা এক কথায় অসাধারণ। আর তার ওপর নচিকেতার ছেলে খোকা সুন্দর সুর করেছেন। আমি তো কেবল তাঁদের বানানো জিনিসটাই শ্রোতার কাছে তুলে ধরেছি। সব কৃতিত্ব গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের।’
ঘূর্ণিঝড় সিডরে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যার্থে গান গাইতে তিন দিনের জন্য ঢাকায় এসেছেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে। গতকাল বুধবার প্রথম আলোর মুখোমুখি হয়েছিলেন গুণী এই শিল্পী।
মান্না দে’র বয়স এখন ৮৯ বছর। কিন্তু গান শুনলে যে কারও মনে হবে এখনো তরুণ। কণ্ঠে এই তারুণ্য ধরে রাখার রহস্যটা কী? মান্না দে’র উত্তর, ‘এটা স্বতন্ত্র উপস্থাপন, স্বতন্ত্র মনোভাবের বিষয়। আমি একটি সাধারণ গৃহস্থঘরের ছেলে। সেভাবেই মানুষ হয়েছি, লেখাপড়া করেছি, সেভাবেই জীবনকে দেখতে ও চলতে শিখেছি। তবে এটা ঠিক, কারও মধ্যে যদি প্রতিভা থাকে, তবে সে কিছু হতে পারবে। আমার কাকা আমার ভেতর হয়তো সে রকম প্রতিভা দেখেছিলেন। তিনিই আমাকে টেনে এনে একদিন বলেছিলেন, ‘গান শেখো।’ গানের জগতে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তিনিই আমাকে রাস্তা দেখিয়েছিলেন। সে জন্য হয়তো আজও গাইছি।’
মান্না দে জানান, তাঁর কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে ছিলেন অন্ধ। সব সময় তাঁর সঙ্গে একজনকে থাকতে হতো। এ কারণেই কাকার সঙ্গে কলকাতা থেকে মুম্বাই যাওয়া। তাঁর সঙ্গে দীর্ঘদিন ছিলেন।
মান্না দে বলেন, ‘কাকাই ছিলেন আমার সংগীত ভুবনের পথপ্রদর্শক। তিনি শিখিয়েছেন কী করে গান করতে হয়, সুর বাঁধতে হয়। ভীষণ বাস্তববাদী মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁর মতো করেই আমি জীবনটাকে দেখতে শিখেছিলাম। কাকা সব সময় বলতেন, কান দুটো খোলা রাখবি। ভালো-মন্দ দুটোই শুনবি। তা না হলে কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ সেই পার্থক্যটা বুঝতে পারবি না।’
মান্না দে’র ভালোবাসার গানে ভালোবাসা যেন উপচে পড়ে। আবার বিরহের গান শুনে শ্রোতাও বিরহকাতর হয়ে যান। এই প্রজ্নের শিল্পীরা কীভাবে কৌশলটা রপ্ত করতে পারবেন? মান্না দে’র উত্তর, ‘কাউকে অযাচিত জ্ঞান দিতে আমি পছন্দ করি না। তবে এটুকু বলব, যাঁরাই গান করবেন, তাঁরা যদি গানটাকে বুঝে করেন, তবেই একটা ফল পাবেন। মানে গানের ভাষার মধ্যে কবি কী বলতে চেয়েছেন, কীভাবে সুর করা হয়েছে, কেমন গায়কি দিয়ে গাইলে সেটা একটা আবেদন সৃষ্টি করতে পারে। তবে আমি এখনো বিশ্বাস করি, সারেগামাপাধানিসা কিংবা ধাগেনাতি নাগেধিনা, ধাগিনা নাতিনা-এগুলো ভালো করে না জানলে ভালো করে গান করা যায় না।’ তিনি বলে চলেন, ‘আর বলব, রবীন্দ্রনাথের গান। আমার কাছে রবীন্দ্রনাথের সব গান স্বরলিপিসহ আছে। আমি বাড়িতে রবীন্দ্রসংগীত করি। আমি তো বলব, ও রকম সুর পৃথিবীতে কেউ করতে পারবে না। গানের কথা ও সুরের এত আত্মীয়তা! গাইতে বসলেই অবাক হই।’
মান্নার প্রতিটি গানই যেন একেকটি গল্প। ‘সে আমার ছোট বোন’, কিংবা ‘খুব জানতে ইচ্ছে করে’, ‘তুমি অনেক যত্ন করে আমায় দুঃখ দিতে চেয়েছ’ কিংবা ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা’-যে গানের কথাই আসুক শ্রোতার মনে একটা ছবি ভেসে ওঠে। তাঁর ৬০ শতাংশ গানেরই গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। অনেকেই বলেন, মান্না আর পুলক হরিহর আত্মা। এ ব্যাপারে মান্নার মন্তব্য, ‘পুলক খুবই জমিদার বংশের ছেলে। সাহিত্যে এমএ করেছিলেন। আমার মতো তাঁরও বড় গুণ ছিল দেখে শেখার। কোনো কিছু দেখলে সেটা পর্যবেক্ষণ করে গান লেখার উপকরণ ঠিকই বের করে ফেলতেন তিনি। যেকোনো আঙ্গিকের গান লেখার ক্ষমতা ছিল তাঁর। তাঁর লেখা প্রথম গান আমি করি ‘আমার যদি না থাকে সুর’। আর শেষ গান করি ‘যখন এমন হয়, জীবনটা মনে হয় ব্যর্থ আবর্জনা, ভাবি গঙ্গায় ঝাঁপ দিই, রেলের লাইনে মাথা রাখি’।
বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারি মানে ভাষার মাস। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবেও সারা বিশ্বে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে মান্নার নিজস্ব অনুভূতি-‘বাংলাদেশকে আমি ভালো করে চিনিনি। তবে শুনেছি, এখানকার শ্রোতারা কলকাতার বাংলা গান খুব শোনে, সেটাকে আমি খুব তারিফ করি। তা ছাড়া বাংলাদেশে বাউল, ঠুমরি, খেয়াল, কীর্তন, ভাটিয়ালি-কী নেই! এই গানগুলো যখন শুনি বা করতে বসি, তখন আমার মনে হয়, এই গান-বাজনার জগৎ দুটো এক হয়ে গেলে ভালো হয় না!’
এই দীর্ঘ জীবনের সেরা প্রাপ্তি কী? অট্টহাসিতে মান্না দে’র জবাব, ‘আমার স্ত্রী’।
মান্না দে’র স্ত্রী সুলোচনা। তাঁদের দুই মেয়ে। বড় মেয়ে সুরমা ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকেন। ছোট মেয়ে সুমিতা। স্ত্রীকে নিয়ে বর্তমানে বেঙ্গালুরুতে বাস করছেন এই শিল্পী।
সূত্রঃ প্রথম আলো।
Bangla Music Tags: Manna Dey, গৌরী প্রসন্ন মজুমদার, মান্না দে
Post Your Comments