কান্তা নন্দী – ও রে কর্ণফুলী রে সাক্ষী রাখিলাম তোরে

Posted by Bangla Music on Jan 25th, 2010 and filed under Featured Artists. 94 views. You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0. You can leave a response or trackback to this entry

কান্তা নন্দী – ও রে কর্ণফুলী রে সাক্ষী রাখিলাম তোরে

তখন তিনি সবে কলেজে পা দিয়েছেন। চট্টগ্রামে আঞ্চলিক নাটকের প্লেব্যাক সিংগার হিসেবে দারুণ জনপ্রিয়। সঞ্জিত আচার্যের সাম্পানওয়ালা নাটকটি মঞ্চস্থ হবে ঢাকায়। পুরো দলই রওনা দিল রাজধানীর উদ্দেশে। ঢাকার বড় বড় সংগীতজ্ঞ ও নাট্যজন উপভোগ করলেন নাটকটি। মঞ্চের পেছনে থেকে গাইলেন সেই প্লেব্যাক সিংগার, ‘আঁর হালকুলত বাড়ি/বন্ধু মন গইরল চুরি’, ‘কি গান মাঝি হুনাইল/কি বাঁশি মাঝি বাজাইল’, ‘আঁর রসিক বন্ধু আইল না’। গানে ঠোঁট মেলালেন অঞ্জু ঘোষ।
নাটক শেষে বিখ্যাত সংগীত পরিচালক সত্য সাহা বিস্মিত, ‘কে গাইল গানগুলো! এমন কণ্ঠের মেয়েটি কে?’ দেখতে চাইলেন তাঁকে। সবাই ধরে নিয়ে এলেন সেই পিচ্চি মেয়েটিকে, প্লেব্যাক সিংগারকে। নাম তাঁর কান্তা নন্দী। সত্য সাহা কান্তার গানের খুব প্রশংসা করলেন। আর সঞ্জিতকে কথা দিলেন, সাম্পানওয়ালা নাটকটি ডিস্ক রেকর্ডে বের করবেন তিনি। কান্তাকে বললেন, ‘গান কিন্তু তুমিই গাইবে।’
দুই. ঢাকার ইপসা স্টুডিওতে রেকর্ডিং হয়েছিল গানগুলো। একক ও দ্বৈত আঞ্চলিক গানে কণ্ঠ দেন সঞ্জিত আচার্য ও কান্তা নন্দী। রেকর্ডিংয়ের সময় সত্য সাহা ‘আঁর হালকুলত বাড়ি’ গানটার কথা কিছুটা পরিবর্তনের পরামর্শ দেন সঞ্জিতকে, যাতে সবাই গানটা বুঝতে পারে। সঞ্জিত গানটার সুর ঠিক রেখে কথা বদলে দেন, ‘ও রে কর্ণফুলী রে সাক্ষী রাখিলাম তোরে/ অভাগিনীর দুঃখর হথা হবি বন্ধু রে’।
তিন মাস পরই সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধা অলিক কুমার গুপ্তের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় কান্তার। স্বামীর সঙ্গে চলে যান সিলেটে। এটা ১৯৭৯ সালের কথা।
সেখানেই তিনি শুনলেন, সত্য সাহা সাম্পানওয়ালা নিয়ে চলচ্চিত্র বানাচ্ছেন। হতাশ হলেন কান্তা। ভাবলেন, সত্যদার ছবিতে কি আর তাঁর গান রাখা হবে! গানগুলো নতুন করে গাইবেন হয়তো সাবিনা ইয়াসমীন-এন্ড্রু কিশোররা।
তিন. কিছু দিন পর খবর পেলেন সাম্পানওয়ালা ছবি মুক্তি পেয়েছে। নাট্যকার সঞ্জিত, নায়ক পংকজ বৈদ্য ও নায়িকা অঞ্জু ঘোষ কান্তার কাছে খবর পাঠালেন, তাঁকে চট্টগ্রামে আসতে হবে। নাটকের পুরো দল একসঙ্গে ছবিটি দেখবে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বামীকে নিয়ে চট্টগ্রামে এলেন। ছবি দেখতে গেলেন নূপুর হলে। স্বামীর সঙ্গে কান্তা বসেছিলেন পেছনের দিকে।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার এ চলচ্চিত্রের নায়ক আকবরের চরিত্রে আলমগীর। আর নায়িকা হাছিনা চট্টগ্রামেরই মেয়ে শাবানা। একটি দৃশ্যে আকবরের বিরহে কাতর হাছিনা (শাবানা) কর্ণফুলীর তীরে দাঁড়িয়ে গেয়ে উঠলেন সেই গান—‘ও রে কর্ণফুলী রে সাক্ষী রাখিলাম তোরে’।
নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না কান্তা নন্দী। এ যে রুনা লায়লা বা সাবিনা নন, এ যে তাঁরই কণ্ঠ!
আশ্চর্য এক ঘটনা ঘটল তখন। পর্দায় শাবানা যখন কেঁদে কেঁদে গানটি গাইছিলেন, তখন দর্শকেরা সবাই তাকাচ্ছেন পেছনে। পর্দায় নয়, সবার চোখ তখন কান্তার দিকে। ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন না কান্তার স্বামী। পংকজকে বললেন, ‘ওরা ছবি না দেখে কান্তাকে দেখছে কেন?’
‘আসলে আমি তো তখন চট্টগ্রামে তারকা। আর এ গানগুলো গেয়েই পেয়েছি তারকাখ্যাতি। সবাই আমাকে চেনে। তাই নায়িকা যখন গানে ঠোঁট মেলাচ্ছিল, তখন দর্শকেরা গানের শিল্পী মানে আমাকে দেখছিল। আমি কিন্তু দারুণ মজা পেয়েছিলাম।’ বললেন কান্তা।
আগে ছিলেন আঞ্চলিক নাটকের প্লেব্যাক সিংগার। সাম্পানওয়ালা ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক সিংগার হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল গোটা দেশে। সেই থেকে ৩০ বছর ধরে গান গেয়ে যাচ্ছেন কান্তা নন্দী।
কান্তার বাবা মধুসূদন নন্দীর বড় শখ ছিল মেয়েকে গান শেখাবেন। মা দীপালি নন্দী বেতারে গান করতেন। তিন বছর বয়সে বাবা সংগীত পরিষদের ওস্তাদ অমল মিত্রের হাতে তুলে দেন মেয়েকে। সেখানে নন্দী সাত-আট বছর গান শিখেছেন। চট্টগ্রাম কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ার সময় ওস্তাদের ভাই শ্যামল মিত্রের আগ্রহে তিনি প্রথম মঞ্চে গান করেন। ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না’ ও ‘সুনো চান্দা সুনো তারা’ গেয়ে সেদিন আসর মাত করেছিলেন কান্তা।
প্রথম প্লেব্যাক করেছিলেন মমতাময়ী মা নাটকে। তবে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় আবদুল গফুর হালীর প্রথম আঞ্চলিক নাটক গুলবাহার। মুসলিম হলে সে নাটক মঞ্চস্থ হলে চারদিকে সাড়া পড়ে যায়। এরপর দুবাইওয়ালা, সোনাবন্ধু নাটকে গান গেয়ে তিনি দর্শকের হূদয়ে স্থায়ী আসন করে নেন।
কান্তা বলেন, ‘নাটকে গেয়েছি আঞ্চলিক গানের কিংবদন্তি জুটি শ্যামসুন্দর বৈঞ্চব ও শেফালী ঘোষের সঙ্গে। এটা আমার জীবনের বড় পাওয়া। তখন তো শ্যাম-শেফালীর গান ছাড়া মঞ্চ জমত না। আগে তাঁদের গান, তার পরে নাটক বা আমাদের গান।’
তিনি কৃতজ্ঞতা জানান গফুর হালীর প্রতি। বলেন, ‘গফুর কাকাই আমাকে আঞ্চলিক ভাষার উচ্চারণ শিখিয়েছেন। এম এন আখতারের গান করেছি। সঞ্জিতদার সঙ্গে দ্বৈত গান ‘বাঁশ ডুয়ার আড়ালত থাই/আঁরে ডাকর কিয়ল্লাই’ গানগুলো এখনো গাইতে হয় মঞ্চে।
সাম্পানওয়ালার গানগুলো নতুন সংগীতায়োজনে গেয়েছেন ক্লোজআপ ওয়ানের শিল্পীরা। শুনেছেন?
কান্তা বলেন, ‘না, শুনিনি। তবে জেনেছি, তাঁরা কথা পরিবর্তন করেছেন, কিছুটা সুরও।’
শোনেননি কেন? ‘কষ্ট পেয়েছি, তাই। আমি তো ঢাকায় থাকি। আমাকে খুঁজে বের করতে কি তাঁদের খুব বেশি কষ্ট হতো? আমাদের না জানিয়ে তাঁদের ইচ্ছেমতো গানগুলো করা হলো!’ বলেন কান্তা।
প্রশ্ন করি, সাম্পানওয়ালার সেই কান্তাকে তো পরে আর পাওয়া যায়নি। একমত হন তিনি। বলেন, বিয়ের পর সংগীতজগতের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। সে কারণে তিনি অনেক সুযোগ এলেও সেগুলো কাজে লাগাতে পারেননি। বলেন, ‘ভাগ্যকে তো আর দোষ দিতে পারি না। হয়তো বড় কোনো সম্মাননা পাইনি, তবে পেয়েছি মানুষের ভালোবাসা। তাই এ বয়সেও মঞ্চে গাইতে হয়। যা পেয়েছি, তা কম কিসে!’

আনন্দ প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জানুয়ারী ২১, ২০১০

Tags: , , , , , ,

Related News:

Leave a Reply

Login with Facebook:

Bangla Music : Incoming search terms

Advertisement