Please Donate

Other Links

এখন শুদ্ধ নজরুল সঙ্গীত চর্চা ও পরিবেশনে কোনো বাধা নেই : সুধীন দাস

Sudhin Das - Bangla Musicনানা কারণে যখন নজরুল সঙ্গীতের সুর ও বাণী বিকৃত হয়ে পড়ে, তখন হাতেগোনা যে ক’জন মহান শিল্পী নজরুল সঙ্গীতের শুদ্ধতা আনয়ন, শুদ্ধ নজরুল সঙ্গীতের লালন ও বিকাশে অসামান্য অবদান রেখেছেন এবং আজো রেখে চলেছেন, তাদের অন্যতম হচ্ছেন সুধীন দাস। তিনি নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপিকার, নজরুল সঙ্গীত শিল্পী। নজরুল ইন্সটিটিউট থেকে তার হাত দিয়ে বেরোয় ১৬ খ- এবং নজরুল একাডেমি থেকে বেরোয় ৫ খ- শুদ্ধ নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি গ্রন্থ। নিজ উদ্যোগে বের করেন সুরলিপি নামে আরেকটি শুদ্ধ নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি গ্রন্থ। লাভ করেন একুশে পদক, নজরুল ইন্সটিটিউট পদকসহ বহু পদক। নজরুল জন্মজয়ন্তী, নজরুল সঙ্গীত ইত্যাদি বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন সৌরভ রাহমান।

নজরুল সঙ্গীতের কথা এলে শুদ্ধ ও বিকৃত কথা দুটি চলে আসে, কারণ কি?
যখন শুদ্ধ জিনিসটাকে শুদ্ধভাবে ব্যবহার করা হয় না, তখন তা বিকৃত হবে এটাই স্বাভাবিক। নজরুলের প্রায় ২০-২২ বছরের সংক্ষিপ্ত সৃষ্টিশীল জীবনের সমগ্র রচনাকে ছাপিয়ে গেছে তার রচিত প্রায় চার হাজার সঙ্গীত। স্বরলিপি ছাড়া সঙ্গীত বাঁচে না। নজরুল সময়ের স্বল্পতা, আর্থিক দূরবস্থা ইত্যাদি কারণে তার সমগ্র সঙ্গীতের শুদ্ধতার সংরক্ষণ করে যেতে পারেননি। নজরুল জীবিত থাকতে মাত্র তিনটি স্বরলিপি গ্রন্থ তার অনুমোদনে প্রকাশিত হয় এবং প্রায় পনেরো থেকে ষোলোশ নজরুল সঙ্গীত গ্রামোফোন রেকর্ডে রেকর্ড হয়। নজরুল নির্বাক হওয়ার পর নজরুল সঙ্গীত নানা চক্রান্তের শিকার হয়, নানাভাবে অবহেলিত হয় এবং অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। আগুনকে ছাইচাপা দিয়ে রাখা যায় না। ফলে ষাটের দশকে নজরুল সঙ্গীত আবার জনপ্রিয় হতে থাকে। এ সময় নজরুল অনুমোদিত গ্রামোফোন রেকর্ড ও স্বরলিপি পাওয়াটা খুবই কষ্টকর ছিল। এ পরিস্থিতিতে এক সময় যারা কলকাতায় নজরুলের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিল তারা নজরুলের গানকে সহজলভ্য করতে গিয়ে নজরুল সঙ্গীতের স্বরলিপি প্রকাশ করে। তাদের করা স্বরলিপি ছিল অনেকটা স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর করা এবং অনেকটা মনগড়া। নজরুল সঙ্গীতের মূল সুর ও বাণীর সঙ্গে যার অনেক বে-মিল লক্ষ্য করা যায়। এ স্বরলিপি অনুসরণ করে আমাদের দেশের শিল্পীরাও নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করতে থাকেন। এভাবেই শুরু হয় নজরুল সঙ্গীতের সুর ও বাণীর বিকৃতি।

শুদ্ধ নজরুল সঙ্গীতের বিকাশে আপনার প্রচেষ্টা সম্পর্কে বলুন।
ষাটের দশকে আমিই প্রথম নজরুল সঙ্গীতের বিকৃতি রোধে সচেষ্ট হই। এ সময় আমি ছিলাম নজরুল একাডেমীর প্রশিক্ষক। নজরুল অনুমোদিত গ্রামোফোন রেকর্ড উদ্ধার করে নজরুল সঙ্গীতের শুদ্ধ স্বরলিপি প্রণয়নে উদ্যোগ গ্রহণ করি। এ সময় আমাকে সহযোগিতা করে নজরুল একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক বিশিষ্ট কবি তালিম হোসেন। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর নজরুল ইন্সটিটিউট স্থাপিত হয়। এ সময় নজরুল ইন্সটিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ খানের সহযোগিতা পাই। স্বরলিপি প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসেবে একুশ খ- স্বরলিপি আমার হাত দিয়ে বেরোয়। বত্রিশ খ- স্বরলিপির বাকি স্বরলিপিগুলো প্রণয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এ সময় নজরুল অনুমোদিত দুষ্প্রাপ্য আদি গ্রামোফোন রেকর্ড থেকে প্রায় সাড়ে চারশটি নজরুল সঙ্গীতের সিডি বের হয় নজরুল ইন্সটিটিউট থেকে। ফলে শুদ্ধ সুর ও বাণীতে নজরুল সঙ্গীত পরিবেশিত হতে দেখা যায়।

আপনি কি মনে করেন এখন শুদ্ধ সুর ও বাণীতে নজরুল সঙ্গীত পরিবেশনে কোনো বাধা নেই?
নজরুল সঙ্গীত শিল্পীরা যদি নজরুলকে সত্যিকারভাবে ভালোবাসেন, নজরুল সঙ্গীতের প্রতি আন্তরিক হন, তবেই এটা সম্ভব। কারণ, নজরুল ইন্সটিটিউট এখন অনেক শুদ্ধ স্বরলিপি প্রণয়ন করেছে, প্রায় চারশ পঞ্চাশটি নজরুল সঙ্গীতের সিডি বের করেছে। ফলে নজরুল সঙ্গীতের সুর ও বাণী বিকৃতির আর কোনো আশঙ্কা নেই।

শুদ্ধ নজরুল সঙ্গীতের বিকাশে নজরুল ইন্সটিটিউট কিভাবে আরো জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে?
নজরুল ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে স্বরলিপি প্রণয়নের যে একটা জোয়ার ছিল, এখন যেন তা থমকে গেছে। অথচ এখনো নজরুলের বহু গান অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। নজরুল ইন্সটিটিউট শুদ্ধ নজরুল সঙ্গীতের বিকাশ ও নতুন শিল্পী সৃষ্টির জন্য অন্তত নজরুলের জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকীতে কিছু কিছু সিডি-ক্যাসেট বের করতে পারে। সর্বোপরি নজরুলের প্রতি আরো ভালোবাসা ও আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারলে এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে পারলে শুদ্ধ নজরুল সঙ্গীতের বিকাশে নজরুল ইন্সটিটিউট প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখতে পারবে।

শুদ্ধ নজরুল সঙ্গীতের বিকাশে মিডিয়ার ভূমিকা যথেষ্ট বলে মনে করেন কি?
মিডিয়ার ভূমিকা যথেষ্ট নয়। কারণ ইদানীং বেতার ও টেলিভিশনে কখনো কখনো বিকৃত নজরুল সঙ্গীতের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মিডিয়ার উদাসীনতার ফলে কিছু শিল্পী জনপ্রিয়তার সুযোগে ইচ্ছেমতো নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করছেন। এ ব্যাপারে মিডিয়ার আরো সচেতনতা প্রয়োজন।

এক্ষেত্রে সরকার কি করতে পারে?
সরকার বহু অর্থ ব্যয়ে নজরুল ইন্সটিটিউট স্থাপন করেছে, প্রত্যয়ন বোর্ড গঠন করেছে, শুদ্ধ নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি প্রণয়ন করছে। সরকার এতো কিছু করছে শুধু শুদ্ধ নজরুল সঙ্গীতের বিকাশের জন্য। তাই সরকারের উচিত হবে বেতার-টেলিভিশনে শুদ্ধ নজরুল সঙ্গীত পরিবেশনের জন্য একটি অনুশাসন প্রণয়ন করে দেয়া।

শুদ্ধ নজরুল সঙ্গীতের বিকাশে মিউজিক কোম্পানিগুলো কিভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?
আমাদের জাতীয় কবির প্রতি ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ মিউজিক কোম্পানিগুলোর উচিত প্রতি বছর অন্তত নজরুলের জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকীতে নতুন শিল্পীদের কিছু সিডি-ক্যাসেট বের করা। এতে শুদ্ধ নজরুল সঙ্গীতের বিকাশ ঘটবে এবং নতুন নতুন নজরুল সঙ্গীত শিল্পীও সৃষ্টি হবে।

নজরুলের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ তার জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকীতেই বেশি দেখা যায়, এটাকে আপনি কিভাবে দেখেন?
নজরুল আমাদের জাতীয় কবি। তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ তার জন্ম-মৃত্যুতে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছরই হওয়া উচিত। তার প্রতি, তার সমগ্র সৃষ্টিকর্মের প্রতি আমাদের আরো ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধাশীল হওয়া প্রয়োজন। তার আদর্শের লালন ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

এখন যারা নজরুল সঙ্গীত শিখছেন তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন।
এমন একটা সময় ছিল যখন একটা শুদ্ধ সঙ্গীত সংগ্রহ করতে অমানুষিক কষ্ট করতে হয়েছে। এখন শুদ্ধ স্বরলিপি-সিডি রয়েছে। যারা শুদ্ধ সুর ও বাণীতে নজরুল সঙ্গীত শেখান তাদের কাছে শিখতে হবে।

সূত্রঃ যায়যায়দিন।

Bangla Music Tags:

Post Your Comments

Bangla Music : Incoming search terms

    নজরুল (1) -