একজন খুরশীদ আলম হয়ে ওঠা
কিছু সুর চির অম্লান, কিছু কণ্ঠ চির অমলিন। সেই সব কণ্ঠের বিচ্ছুরণ ঘটছে বাংলার প্রকৃতিতে, সব শ্রেণীর মানুষের কাছে। তেমনি এক কণ্ঠের জাদুকর মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। যিনি দরদমাখা কণ্ঠে গান গেয়ে চলেছেন আজ পর্যন্ত। এই গুণী কণ্ঠশিল্পীর জন্ম ১৯৪৬ সালে জয়পুরহাট জেলার হারুনজায়। তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে সবার বড় খুরশীদ আলম। তার বাবা এ এফ তসলিমউদ্দিন এবং চাচা ডা. আবু হায়দার সাজেদুর রহমান। ছোটবেলা থেকেই খুরশীদ আলমের সঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণ ছিল। পরিবারের তেমন কেউ সঙ্গীতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। চাচা ডা. সাজেদুর রহমান টুকটাক রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতেন। আর চাচার কাছেই সঙ্গীতের হাতেখড়ি খুরশীদ আলমের। স্কুল জীবনে গানের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন তিনি। স্কুল বন্ধুদের অনুপ্রেরণায় তার সঙ্গীতে পদার্পণ। তার শিক্ষা জীবন কাটে নবাবপুর গভর্নমেন্ট হাই স্কুল, কলেজ অফ মিউজিক এবং তৎকালীন সরকারি জগন্নাথ কলেজে (বর্তমানে জগন্নাথ ইউনিভার্সিটি)।
১৯৬১-৬২ সালে জাতীয় আধুনিক সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় এবং ১৯৬২-৬৩ সালে জাতীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় প্রথম হন তিনি। বাংলাদেশ বেতারে আধুনিক গানের অডিশন দিতে এসে পরিচয় হয় প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক সমর দাসের সঙ্গে। সমর দাস তাকে নিয়ে গেলেন সঙ্গীতের ওপর বিশেষ শিক্ষা দেয়ার জন্য।
তিনি তাকে শিখিয়েছেন কিভাবে কোন বিখ্যাত শিল্পীকে অনুসরণ করে ভালো গান করা যায়। তিনি তাকে প্রায় ছয় মাস সঙ্গীতের ওপর জ্ঞান দান করেন। এরপর আজাদ রহমানের সঙ্গে সঙ্গীত নিয়ে দুই বছর কাজ করেন তিনি।
১৯৬৭ সালে কবি সিরাজুল ইসলামের (প্রয়াত) লেখা এবং আজাদ রহমানের সুরে কণ্ঠ দেন একটি আধুনিক গানে। যেটার কথা হলো তোমার দু-হাত ধরে শপথ নিলাম। সে সময়ে গানটি তৎকালীন পুরো পাকিস্তানে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বর্তমানেও গানটি বেশ জনপ্রিয়। সে বছরই তার কণ্ঠে আরেকটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী গান হলো- ‘‘চঞ্চল দু’নয়নে বলো না কি খুজছো?’’ মোহাম্মদ খুরশীদ আলম প্রথম প্লে ব্যাক করেন ১৯৬৯ সালে বাবুল চৌধুরীর পরিচালনায় এবং ইফতেখারুল আলমের প্রযোজনায় আগন্তুক মুভিতে। ১৯৬৯ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিনশ মুভির গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। উল্লেখ্য, তিনি লালুভুলু মুভির সাতটি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। সেই মুভিটিকে চারটি ভাষায় রূপান্তরিত করা হয়েছিল।
তার স্ত্রী রীনা আলম এবং দুই মেয়ে মেহরিন আলম ও মেহনাজ আলম। গান নিয়ে কেটে যায় তার সারাদিন। অবসরে গান শোনেন, ক্রিকেট খেলা দেখেন। বাংলাদেশ সরকারের প্রতি তার একটি আবেদন, সরকার যেন সঙ্গীত সংশ্লিষ্টদের প্রতি সদয় দৃষ্টি জ্ঞাপন করে।
খুরশীদ আলমের গাওয়া অনেক গান রয়েছে জনপ্রিয়তার তালিকায়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
১. মাগো মা, ওগো মা, আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা।
মুভির নাম- সমাধি
গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার
সুরকার - সত্য সাহা
২. তোমরা যারা আজ আমাদের ভাবছো মানুষ কি না…।
মুভি- লালুভুলু
গীতিকার- মাসুদ করিম
গুরকার - সুবল দাস।
৩. বন্দি পাখির মতো মনটা কেদে মরে
মুভি- আগন্তুক
৪. ধীরে ধীরে চল ঘোড়া, সাথী বড় আনকোরা…
মুভি- শাপমুক্তি
সুরকার- সত্য সাহা
৫. ও দুটি নয়নে স্বপনে চয়নে নিজেরে যে ভুলে যাই…
মুভি- অশ্রু দিয়ে লেখা
সুরকার- আলী হোসেন।
৬. বাপের চোখের মণি নয়, মায়ের সোনার খনি নয়…।
মুভি - জোকার
সুরকার - আনোয়ার পারভেজ
গীতিকার - গাজী মাযহারুল আনোয়ার
৭. চুমকি চলেছে একা পথে, সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে…।
মুভি - দোস্ত দুশমন
গীতিকার - দেওয়ান নজরুল
সুরকার - আলম খান
৮. যে সাগর দেখে তৃপ্ত দু চোখ…
গীতিকার - মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান
সুরকার - খন্দকার নুরুল আলম
৯. ঐ আকাবাকা নদীর ধারে…
গীতিকার - এম এম হেদায়েত
সুরকার - আলী হোসেন
১০. তোমার দু’হাত ধরে শপথ নিলাম (আধুনিক)
সুরকার - আজাদ রহমান
গীতিকার - কবি সিরাজুল ইসলাম
খুরশীদ আলমের কাছে জানতে চাওয়া কিছু বিষয়
বর্তমানে গানের যে বিবর্তন সেই সম্পর্কে বলুন
খু আ : আগের চেয়ে গানের ধরন বর্তমানে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগে আমরা একটি গান করতে শিল্পী, গীতিকার, সুরকার সবাই মিলে টোটাল কাজটা করতাম। আর এখন সবকিছু রেডি থাকে। শিল্পী শুধু গান গেয়ে চলে যান। বর্তমানে গানে প্রযুক্তির ব্যবহার বেশি হচ্ছে।
এখন গান করার সময় সংশ্লিষ্টরা গানটি মানসম্পন্ন হলো কি না তার চেয়ে বেশি ভাবে গানটি হিট করবে কি না। অনেকে আবার ফোক গান ভেঙে মডার্ন ধাচের গানে পরিণত করছেন।
নতুন যারা সঙ্গীতে আসছেন তাদের সম্পর্কে আপনার অভিমত
খু আ : নতুনরা অনেক ভালো করছে। তারা তাদের সাধ্য অনুযায়ী অগ্রসর হচ্ছে। তাদের সুবিধা হলো সিডি, অডিও দুটি মাধ্যম।
নতুনদের জন্য কিছু টিপস
খু আ : বর্তমানে ইন্সট্রুমেন্টের ব্যবহার বেশি। তবে যতোই হৈ-হুল্লোড় জাতীয় গান করা হোক না কেন তার একটা নির্দিষ্ট সীমা থাকা দরকার।
বাংলাদেশের সঙ্গীত নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?
খু আ : যতো দিন জীবিত আছি, ভালো গান গেয়ে বাচতে চাই।
আপনার ভক্ত-শ্রোতাদের উদ্দেশে কিছু বলুন
খু আ : সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি যেন সুস্থ থাকি। খুব শান্তিপূর্ণভাবে যাতে আমার মৃত্যু হয়।
সূত্রঃ যায়যায়দিন।
Bangla Music Tags: খুরশীদ আলম, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মোহাম্মদ মনিরুজ্জাম

Post Your Comments