আব্বাসউদ্দীন আহমদ স্মরণীয় বরণীয়
যে সময় বাংলার মাঠে মাঠে বিছিয়ে থাকে সোনালি ধানের ছড়া, যে সময় কৃষকের মনে আনন্দের বন্যা থৈ থৈ করে, যে সময় ঘরে ঘরে নতুন ধানের পিঠা-পায়েসের ধুম, যে সময় পাখিরা গায় মধুর মিলনের গান ঠিক এমনই অগ্রহায়ণে প্রথম কান্নার সুর ছড়িয়ে আব্বাসউদ্দীন আহমদ জানিয়ে দিলেন এই অঙ্গীকার- তিনি এসেছেন বাংলার আকাশে-বাতাসে উড়িয়ে দিতে পাড়া-গায়ের অবলা নারীর প্রেমের আকুতি, কিষাণ মাঝির অব্যক্ত পাওয়া না পাওয়ার বেদনা। আর দু’দিন পরই পালিত হবে তার ৫৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে বাংলার এ প্রবাদপ্রতিম পুরুষের ওপর আজ ছাপা হলো বিশেষ এ লেখাটি।
ভাওয়াইয়া গানের প্রবাদপ্রতিম কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ কুচবিহারের তুফানগঞ্জ মহকুমার বলরামপুর গ্রামে ১৯০১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মৌলভী মোঃ জাফর আলী আহমদ এ অঞ্চলের জোতদার এবং একজন প্রথিতযশা আইনজীবী ছিলেন। তার মায়ের নাম ছিল হীরামন নেসা।
আব্বাসউদ্দীন আহমদের লেখাপড় শুরু হয় বলরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯২০ সালে। তুফানগঞ্জ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পর তিনি ভর্তি হন কুচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজে। আইএ পাস করার পর লক্ষ্ণৌতে গিয়ে বিখ্যাত মরিস সঙ্গীত কলেজে ভর্তি হওয়ার প্রচণ্ড ইচ্ছা থাকলেও বাবার ইচ্ছা না থাকায় তার সে ইচ্ছা পূরণ হয়নি। এরপর বিএ পড়তে তিনি প্রথমে রংপুর কারমাইকেল কলেজ এবং পরে রাজশাহী কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তিনি এ দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হস্টেলে বেশিদিন থাকতে পারেনি। এরপর তিনি বিএ পড়েছেন কুচবিহার কলেজে।
আব্বাসউদ্দীন আহমদ ছেলেবেলা থেকেই মেধাবী ছিলেন। স্কুল জীবনে বাড়ির সামনে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠে কৃষকের উদাত্ত কণ্ঠের ভাওয়াইয়া গান তার মনকে আলোড়িত করে। ওই সময় ওস্তাদের কাছে গান শেখার সুযোগ না পেলেও গ্রাম্য গায়ক এবং ক্ষেতে কর্মরত কৃষকের গান শুনে শুনে তিনি শিখে ফেলতেন। স্কুলে যাওয়ার সময় এবং স্কুল থেকে ফেরার সময় গলা ছেড়ে গাইতেন সে গান । তারই গ্রামের শিল্পী পাগারু এবং নায়েব আলী টেপুর ভাওয়াইয়া গান ও দোতারার ডাং তাকে ভাওয়াইয়া গান শিখতে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি প্রকৃতির কাছ থেকেও সঙ্গীত শিক্ষা নিয়েছেন ক্ষণে ক্ষণে। তার ভাষায় ‘ছোটবেলা থেকেই ওই মোরগের ডাক, শিয়ালের ডাক, ঘুঘুর ডাক, পায়রার ডাক, কোকিল, দোয়েল, বউ কথা কও, পাপিয়ার ডাকের সুর শুনে শুনে আমার গলায় সুর বাসা বেধেছিল। এমনকি স্কুলের যখন ঘণ্টা পড়তো সেই ঘণ্টা শব্দের শেষ সুরটুকু, ঢং এর ঢং টুকু গলায় তুলে নিতাম।’
আব্বাসউদ্দীন আহমদের গ্রামের বাড়ির পূর্বে মাঠ, মাঠের পরে কালজানি নদী; গ্রাম, মাঠ, নদী, চর, দীর্ঘ পথ-প্রান্তর ভাওয়াইয়া গানের উপযুক্ত পরিবেশ। ‘আমার গ্রামে ছিল বহু ভাওয়াইয়া গায়ক, সারা গ্রামটি সকাল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত গানের সুরে মুখরিত হয়ে থাকতো। বাড়ির পূর্বে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ। আমাদের আধিয়ারী প্রজারা হাল বাইতে বাইতে, পাট নিড়াতে নিড়াতে গাইতো ভাওয়াইয়া গান। সে-সব গানের সুরেই আমার মনের নীড়ে বাসা বেধেছিল ভাওয়াইয়া গানের পাখি’ বলেছেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ।
আব্বাসউদ্দীন আহমদ যখন গায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন তখন মুসলমানদের গান গাওয়া ছিল হারাম। সে কারণে কাসেম আলী মল্লিক নামে এক মুসলমান শিল্পীকে মল্লিক ছদ্মনামে গাইতেন। কিন্তু আব্বাসউদ্দীন আহমদ মুসলমান নাম নিয়েই গান করতেন এবং তার ভিন্ন রকম গায়কী ও সুরেলা কণ্ঠ জয় করেছিল অসম্ভব প্রতিকূল অবস্থাকে। এটা ছিল আব্বাসউদ্দিনের বড় কৃতিত্ব। যে মুসলমানরা গানকে হারাম বলে কানে আঙুল দিতেন তারাই পরে আব্বাসউদ্দিনের কণ্ঠে অবাক বিস্ময়ে শুনতেন, ‘মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়’ প্রভৃতি ইসলামী গান। এ বিষয়ে আব্বাসউদ্দীন আহমদ কবি কাজী নজরুল ইসলামকে একদিন বলেন, ‘একটা কথা মনে হয় এই যে, পিয়ারু কাওয়াল, কালু কাওয়াল এরা উর্দু কাওয়ালি গায়, এদের গানও শুনি অসম্ভব বিক্রি হয়। এই ধরনের বাংলায় ইসলামী গান দিলে হয় না? তার পর আপনি জানেন, কিভাবে কাফের কুফর বলে বাংলার মুসলমান সমাজের কাছে আপনাকে অপাঙক্তেয় করে রাখার জন্য আদাজল খেয়ে লেগেছে একদল ধর্মান্ধ। আপনি যদি ইসলামী গান লেখেন তাহলে মুসলমানদের ঘরে ঘরে আবার জেগে উঠবে আপনার জয়গান। কবি কাজী নজরুল ইসলাম এ ব্যাপারে গ্রামোফোন কম্পানির কর্মকর্তা ভগবতী ভট্টাচার্যের মত নিতে বললেন আব্বাসউদ্দীন আহমদকে। আব্বাসউদ্দীন আহমদের পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত ভগবতী ভট্টাচার্য মত দিয়েছিলেন। এরপর কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ও সুর করা রোজা, নামাজ, হজ, জাকাত, ঈদ, শবেবরাত, ফাতেহা, হামদে এলাহি, নাতে রাসূল ও ইসলামী গজল ধরনের অনেক গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ।
আব্বাসউদ্দীন আহমদের কণ্ঠে ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’, ‘তোরষা নদী উথাল পাতাল, কাবরা চলে নাও’, ‘প্রেম জানে না রসিক কালাচান’ ইত্যাদি ভাওয়াইয়া গান গ্রামোফোন রেকর্ডে যখন বাধা পড়ে, ছড়িয়ে পড়ে দেশের আনাচে-কানাচে দূর-দূরান্তে। তার কণ্ঠের মাদকতা ভাওয়াইয়া গানের ভাব ও সুরকে আরো মোহনীয় করে তোলে। তিনি সভা সমিতিতে গান গেয়েও ভাওয়াইয়া গানকে শিক্ষিত শ্রেণীর কাছে পরিচিত ও জনপ্রিয় করে তোলেন। আব্বাসউদ্দীন ও ভাওয়াইয়া ক্রমে এক ও অভিন্ন সত্তায় পরিণত হয়। গ্রামোফোন কম্পানিতে কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ভাওয়াইয়া গানও তিনি রেকর্ড করেছেন। ভাওয়াইয়া গানের প্রতি কবি কাজী নজরুল ইসলামের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করে আব্বাসউদ্দীন আহমদ বলেন, ভাওয়াইয়া গান শুনলেই কবি বড় চঞ্চল হয়ে উঠতেন। বহুদিন বলেছিলেন, জানি না এ গানের সুরে কি মায়া, আমার মন চলে যায় কোন পাহাড়িয়া দেশের সবুজ মাঠের আকাবাকা আলোর প্রান্তিকে উপপ্রান্তিকে। আব্বাসউদ্দীন আহমদ ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের পর তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানে গান গাওয়া শুরু করেছিলেন। চাকরি নিয়েছিলেন পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্টে।
ভাওয়াইয়া গানের জনক ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদ দীর্ঘদিন রোগভোগের পর (পক্ষাঘাতগ্রস্ত থেকে) ১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৭টা ২০ মিনিটে ৬৮/১ পুরানা পল্টনে তার নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মৃত্যুকালে তার স্ত্রী লুৎফুন্নেসা আব্বাস, বড় ছেলে সাবেক বিচারপতি মোস্তফা কামাল, ছোট ছেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক, সঙ্গীত শিল্পী ও সঙ্গীত গবেষক মোস্তফা জামান আব্বাসী, একমাত্র মেয়ে সঙ্গীত শিল্পী ও সঙ্গীত গবেষক ফেরদৌসী রহমান ও নাতি-নাতনিদের রেখে যান।
সূত্রঃ যায়যায়দিন।
Bangla Music Tags: Abbas Uddin, আব্বাসউদ্দীন

Post Your Comments