আধুনিক ও ব্যান্ড সঙ্গীতের সিরিয়াস সুরকার-শিল্পী নকীব খান

Nakib Khanসোলসের মন শুধু মন ছুয়েছে, রেনেসার হৃদয় কাদামাটি, তপন চৌধুরীর মন পবনের নাও, কুমার বিশ্বজিতের তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে, সামিনা চৌধুরীর ঝিনুক ফোটা সাগর বেলা, ফাহমিদা নবীর তুমি তুলনাহীনাসহ অসংখ্য কালজয়ী গান যার নিপুণ সুরের জাদুতে সৃষ্টি তিনি নকীব খান। আধুনিক ও ব্যান্ড সঙ্গীতের এ সিরিয়াস সুরকার ও শিল্পী গানের পাশাপাশি ইন্টারন্যাশনাল ফুড প্রডাক্টস কম্পানি নেসলে বাংলাদেশ লিমিটেডের সাপ্লাই চেইন ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন দীর্ঘ দিন। সেই সঙ্গে অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গানচিলের উপদেষ্টা হিসেবেও একজন সফল ব্যক্তি তিনি। সম্প্রতি যায়যায়দিনের চে কাফেতে এসেছিলেন তিনি। তার সঙ্গে কথা বলেছেন টি আই অন্তর। ছবি তুলেছেন শরীফ সারওয়ার

হাজার মাইল পথের সূচনা হয় একটি ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে, জানতে চাচ্ছি সঙ্গীত ভুবনে আপনার প্রথম পদচারণা কেমন ছিল?
শুরুটা হয় ফ্যামিলির মাধ্যমে। আমার বাবা গান করতেন। নানা কাওয়ালি গাইতেন। বড় ভাই জিলু খান বালার্ক ব্যান্ডে বাজাতেন। আমিও বাজাতাম ওই ব্যান্ডে। ছোট ভাই পিলু খান একজন দুর্দান্ত ড্রামার। খুব সুন্দর সুর করতো সে। রেনেসার বেশ কিছু শ্রোতাপ্রিয় গান তার সুর করা। আমাদের ফ্যামিলিটাই ছিল একটা সঙ্গীত শিক্ষালয়ের মতো। সঙ্গীতের অনেক কিছুই আমি জেনেটিকালি পেয়েছি। বাকিটা প্র্যাকটিসের মাধ্যমে। সঙ্গীতে আমার পদচারণা ফুলে ভরা না হলেও কণ্টকাকীর্ণ ছিল না।

বালার্ক থেকে সোলস, সোলস থেকে রেনেসা। পরিবর্তনের নেপথ্যে কি ছিল?
বালার্কই ছিল আমার প্রথম ব্যান্ড। ব্যান্ড মেম্বারদের ভিন্ন ক্যারিয়ার আর ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে ৭৪ সালে বালার্ক ভেঙে যায়। ওই বছরই আমি কি-বোর্ডিস্ট হিসেবে সোলসে জয়েন করি। সোলসে তখন কি-বোর্ডিস্ট ছিল না এবং তখন পর্যন্ত সোলসের কোনো নিজস্ব গানও ছিল না। আমি জয়েন করার পর একটি দুটি করে গান তৈরি করতে থাকি। ’৮০ সালে সোলসের প্রথম অ্যালবাম সুপার সোলস বের হয়। এ অ্যালবামের সব গানই ছিল আমার সুর করা। তার মধ্যে মন শুধু মন ছুয়েছে এবং মুখরিত জীবন গান দুটি তুমুল শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। ’৮২-তে বের হয় সোলসের দ্বিতীয় অ্যালবাম কলেজের করিডোরে। ’৮৩ সালে আমার বাবা মারা যাওয়ার পর ’৮৪ সালে ঢাকায় চলে আসি। ঢাকায় এসে লাকী আখন্দ ও হ্যাপি আখন্দের সঙ্গে ফজলে রাব্বানীর বাসায় প্র্যাকটিস শুরু করি। এক সময় লক্ষ্য করি, শুধু প্র্যাকটিস করে আর মন ভরছে না। ’৮৫ সালের দিকে আমি, বগি ভাই, পিলু আর মোটো মিলে রেনেসা গঠন করি। এই তো!

এ পর্যন্ত প্রকাশিত রেনেসার অ্যালবামগুলো সম্পর্কে বলুন।
এ পর্যন্ত রেনেসার চারটি অ্যালবাম প্রকাশ পেয়েছে। সেল্ফ টাইটেল নিয়ে রেনেসার প্রথম অ্যালবাম প্রকাশ পায় ’৮৮ সালে। এটি প্রকাশ করে সারগাম। ’৯৩ সালে বের হয় রেনেসার দ্বিতীয় অ্যালবাম। চট্টগ্রামের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মিউজিক বেঙ্গল প্রকাশ করে এ অ্যালাবাম। নাম তৃতীয় বিশ্ব। ’৯৮ সালে জি-সিরিজ প্রকাশ করে রেনেসার তৃতীয় অ্যালবাম একাত্তরের রেনেসা। সর্বশেষ ২০০৪ সালে এক তারের ব্যানারে চতুর্থ অ্যালবাম একুশ শতকের রেনেসা মুক্তি পায়।

দীর্ঘ ২২ বছরে রেনেসার অ্যালবাম সংখ্যা মাত্র চারটি। অন্যান্য ব্যান্ডের তুলনায় এ সংখ্যাটি খুবই নগণ্য নয় কি?
হ্যা। কিন্তু এর পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আমরা একটা সারটেইন স্টেইজে ব্যান্ড করেছি, বাংলা গান যখন সরে যাচ্ছিল তার নিজস্ব জায়গা থেকে। ঠিক ওই সময়টায় আমরা শিল্প-সংস্কৃতির নতুন জাগরণ ঘটানোর প্রয়াস নিয়েই রেনেসা গঠন করি এবং সব সময়ই আমরা গড্ডলিকার উল্টো স্রোতে ছিলাম। যার ফলে, আমাদের অ্যালবাম সংখ্যা কম। তাছাড়া বছর বছর অ্যালবাম প্রকাশ করার পেছনে একটা বাণিজ্যিক চিন্তা-ভাবনা থাকে। রেনেসার সদস্যদের কেউই টাকার জন্য মিউজিক করেনি। আমাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ক্যারিয়ার।

রেনেসার বিখ্যাত গান আজ যে শিশু প্রকাশিতব্য একটি আন্তর্জাতিক অ্যালবামে স্থান পেয়েছে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত বলুন।
ইউনিসেফের আন্তর্জাতিক শিশু তহবিলের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিতব্য একটি অ্যালবামে স্থান পেয়েছে গানটি। সারা বিশ্বের শিশুদের জন্য নির্মিত অ্যালবামটিতে আমেরিকা, কানাডা, ইংল্যান্ড, জার্মানি, জাপান, ইটালি, ইনডিয়া ও বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের গান থাকবে এ অ্যালবামে। ইউনিসেফ বিশ্ব শিশুদের জন্য নানা ভাষার একটি অ্যালবাম করার উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন দেশে নিয়োজিত তাদের মুখপাত্রের মাধ্যমে গান নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরব এমিরেটসের মুখপাত্র মির্জা সামসুজ্জামান আমাদের এ গানটি অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রাখেন। ইউনিসেফের কর্মকর্তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ প্রস্তাব গ্রহণ করেন। অ্যালবামটি কবে ও কোথা থেকে মুক্তি পাবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু আমরা এখনো জানতে পারিনি। তবে ইউনিসেফের কর্মকর্তারা আমাদের কাছ থেকে গানটি নিয়ে গিয়েছেন।

রেনেসার বর্তমান কার্যক্রম কি?
বর্তমানে রেনেসার পরবর্তী অ্যালবামের কাজ চলছে। এ পর্যন্ত তিনটি গান রেডি হয়েছে। খুব ধীরে ধীরে কাজ করছি আমরা। সব গান শেষ করতে হয়তো আরো একটা দীর্ঘ সময় লেগে যাবে। আশা করছি ২০০৮ সালে আমরা শ্রোতাদের কাছে নতুন অ্যালবাম পৌছাতে পারবো। এছাড়া মাঝে মধ্যে আমরা স্টেইজ শোতেও অংশ নিচ্ছি।
ব্যান্ডের লাইন-আপে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ফাউন্ডার মেম্বার ও বেইজ গিটারিস্ট বগির জায়গায় তানিমকে দেখা যাচ্ছে। রেনেসার বর্তমান লাইন-আপে কে কে রয়েছেন?
বগি ভাই অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান একতারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এবং ব্যক্তিগত আরো কিছু কারণে ২০০৫ সালে রেনেসা ছেড়ে দেন। বগি ভাইয়ের জায়গায় এখন তানিম বাজাচ্ছে। বর্তমান লাইন-আপে ড্রামসে রয়েছেন পিলু খান, লিড গিটারে রেজা, বেইজ গিটারে তানিম, পারকাশনে কাজী হাবলু, হারমোনিকায় ডা. মুন্না, রিদম অ্যান্ড ভোকালে ইমরান আর কি-বোর্ডিস্ট ও ভোকালিস্ট হিসেবে রয়েছি আমি।

রেনেসার বাইরে আপনার একটি একক অ্যালবাম প্রকাশ পেয়েছিল। অ্যালবামটি সম্পর্কে কিছু বলুন।
’৯৯ সালে আমার প্রথম ও শেষ একক অ্যালবাম প্রকাশ পায়। সারগামের ব্যানারে এ অ্যালবামটির নাম ছিল স্বপ্ন জড়ানো। অ্যালবামের গানগুলো সব আমারই সুর করা। গানগুলো লিখেছেন হেনা ইসলাম, শহীদ মাহমুদ জঙ্গী, ইকবাল প্রমুখ। ওরে ছোট, ঘুম নেই ঘুম হারা, মাটিসহ বেশ কিছু ভালো গান ছিল এ অ্যালবামে।

ব্যান্ডের বাইরে এ পর্যন্ত আপনি অনেক সলো শিল্পীর জন্যই সুর করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু গানের কথা বলুন।
তপন চৌধুরীর মন পবনের নাও অ্যালবামটির সব গানই আমার সুর করা। কুমার বিশ্বজিতের তোরে পুতুলের মতো করে, সুখ ছাড়া দুখসহ আরো অনেক গান করেছি। এ মুহূর্তে সব মনে পড়ছে না। সামিনা চৌধুরীর শৈশবের দিনগুলো অ্যালবামটিও পুরোপুরি আমার করা। এ অ্যালবামের ঝিনুক ফোটা সাগর বেলা গানটি বেশ শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। ফাহমিদা নবীর প্রথম অ্যালবাম তুমি তুলনাহীনা আমার করা। এছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে আরো অনেকের গানই তো করেছি। এখন তো সব মনে নেই। রাজীব, নোলক, বিউটি, সাব্বির, কিশোর, রন্টির কিছু মৌলিক গান করেছি। এগুলো বিভিন্ন মিক্সড অ্যালবামে মুক্তি পেয়েছে। সর্বশেষ গত রমজানের ঈদে করেছি রাশেদের ফেরিওয়ালা অ্যালবামটি।

বর্তমানে কাদের গান করছেন?
তপন চৌধুরীর পরবর্তী একক অ্যালবামের জন্য কয়েকটা গান করছি। অ্যালবামটি কবে প্রকাশ পাবে জানি না। তপন আমার কাছে কিছু গান চেয়েছে তাই করছি। এছাড়া কিশোর ও রন্টির একক অ্যালবামের জন্য কিছু গান করছি। প্রফেশনাল ব্যস্ততার জন্য গানে যথেষ্ট সময় দিতে পারছি না। মাঝে মধ্যে শখের বসে দুই-একটি গান করছি। গান করা তো আমার প্রফেশন নয়।

সবশেষে বলুন, গানচিলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন কেন?
আমাদের সঙ্গীত অনেক সমৃদ্ধ একটা শিল্প। যার সুদূর ঐতিহ্য আমাদের সব সময় অনুপ্রাণিত করে। তাই এর উপযুক্ত লালন-পালন সংশ্লিষ্ট সবারই একটা গুরুদায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে আমরা অনেকটা পিছিয়ে আছি। মিউজিক ইন্ড্রাস্ট্রির বর্তমান অবস্থা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। অতি মাত্রায় বাণিজ্যিক চিন্তা-ভাবনা আমাদের শিল্পটাকে কলুষিত করে ফেলেছে। যার ফলে ক্রমান্বয়ে মেধাহীন হয়ে পড়ছে গানের জগৎটা। এখন প্রয়োজন আমাদের মেধাগুলোকে সঠিক পথে পরিচালনা, যার যতোটুকু প্রাপ্য তাকে সেভাবে মূল্যায়ন। এ ক্ষেত্রে গানচিল কিছুটা হলেও গতির সঞ্চার করবে বলে আমার বিশ্বাস। তাই গানচিলের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা।

সূত্রঃ যায়যায়দিন।

Bangla Music Tags: , ,

Related posts

Post Your Comments

*
To prove you're a person (not a spam script), type the security text shown in the picture. Click here to regenerate some new text.
Click to hear an audio file of the anti-spam word

Bangla Music : Incoming search terms

    nakib khan (3) - নকীব খান (1) - nakib khan songs (1) - শিশুদের জন্য (1) - সূচনা বাংলা গান (1) - তুলনাহীনা (1) -