অস্ট্রেলিয়া মাতিয়ে এলো মাইলস
![]()
অস্ট্রেলিয়ায় বাঙালি কমিউনিটির অর্গানাইজেশন টেমপেস্ট্রা এন্টারটেইনমেন্টের আমন্ত্রণে ২০ জুন অস্ট্রেলিয়া যায় বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড মাইলস। অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরাতে প্রায় কাছাকাছি সময়ে দুটি সফল কনসার্ট শেষে ২ জুলাই দেশে ফিরে আসে মাইলস সদস্যরা। কনসার্ট দুটির বিভিন্ন দিক, অভিজ্ঞতা, অস্ট্রেলিয়ায় বাঙালি কমিউনিটিতে দেশীয় সংস্কৃতিচর্চা এবং অন্যান্য বিষয়ে যায়যায়দিনের বিনোদনের সঙ্গে আড্ডায় মেতে প্রাণ খুলে কথা বলেছেন মাইলসের মানাম আহমেদ, হামিন আহমেদ, শাফিন আহমেদ ও জুয়েল।
মানাম আহমেদ : প্রায় তিন মাস আগে আমরা অস্ট্রেলিয়ায় কনসার্টের ইনভাইটেশন পাই। অর্গানাইজারদের কাগজপত্রসহ অন্য সবকিছু যাচাই-বাছাই করে নিশ্চিন্ত হওয়ার পর আমরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করি।
হামিন আহমেদ : দেশের বাইরে কনসার্টের ক্ষেত্রে সবসময়ই আমরা একটু ভিন্নভাবে চিন্তাভাবনা করি। বিশেষত যারা আমাদের ইনভাইট করছে, তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড কী, তারা সত্যিকারের অর্গানাইজার কি না, কনসার্টের জন্য ওই দেশের সরকারের অনুমতি রয়েছে কি না ইত্যাদি যাচাই-বাছাই করেই আমরা সিদ্ধান্ত নিই।
শাফিন আহমেদ : প্রস্তুতি হিসেবে আমরা নিজেদের প্র্যাকটিস প্যাডে বেশ কয়েক দিন প্র্যাকটিস করি। অনেকে আমাদের প্র্যাকটিসের কথা শুনে খুবই অবাক হয়। মাইলসের আবার প্র্যাকটিস করতে হয় নাকি! কিন্তু আমরা মনে করি, যে কোনো ব্যান্ডের জন্যই প্র্যাকটিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বিশেষ করে যে ব্যান্ডগুলো নিয়মিত স্টেজ শোতে অংশ নেয়, তাদের জন্য প্র্যাকটিস অপরিহার্য। প্র্যাকটিস না করলে পারফরম্যান্সের কোয়ালিটি দিন দিন কমতে থাকে। যাহোক, সব রকমের প্রস্তুতি শেষে আমরা ২০ জুন রাতে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পৌঁছাই।
ইকবাল আসিফ জুয়েল : অস্ট্রেলিয়ায় তখন প্রচণ্ড শীত। রাতে টেম্পারেচার নেমে ছয়-সাতে এসে পড়েছে। তবে আবহাওয়া ছিল চমৎকার। হঠাৎ প্রচণ্ড গরম থেকে গিয়ে শীতে পড়ে সর্দি-কাশি-জ্বর হওয়া এ রকম কোনো ভোগান্তির শিকার হতে হয়নি। বরং ওখানকার আবহাওয়াটা আমরা বেশ এনজয় করেছি।
মানাম আহমেদ : একটা ব্যাপার আমার কাছে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মনে হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ায় কর্মদিবস শুরু হয় সকাল ৬টায় আর শেষ হয় বিকাল ৪টায়। অর্থাৎ বিকাল ৪টার পর কোনো দোকানপাট খোলা থাকে না। যার কারণে আমরা তেমন কোনো কেনাকাটা করতে পারিনি।
হামিন আহমেদ : কেনাকাটার দিকে অবশ্য আমাদের মনোযোগও ছিল কম। অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেই আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছি স্টেজ, লাইট, সাউন্ড সিস্টেম এবং প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্টস নিয়ে। অন্যরা দেশের বাইরে গিয়েই সর্বপ্রথম বেরিয়ে পড়ে ঘোরা আর কেনাকাটার জন্য। আমরা তা করিনি।
শাফিন আহমেদ : এ জন্য আমাদের অর্গানাইজাররা বেশ অবাক হয়েছে। তার চেয়েও বেশি অবাক হয়েছে অস্ট্রেলিয়ান সাউন্ড সিস্টেমের লোকজন। তারা ভেবেছিল সচরাচর যে রকম শো হয়, তাই হবে। ফলে তারা যেভাবে প্রস্তুতি নেয়, এবারো সে রকমই প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু আমরা যখন আমাদের মতো, আমাদের প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্টস দাবি করি, তাদের মধ্যে বেশ নাক-উস্কানি ভাব দেখা যায়। কিন্তু শো শুরু হওয়ার পর দেখা গেল, তাদের মানসিকতা পুরোপুরি বদলে গেছে। তখন তারাই আমাদের জন্য কী করবে না করবে এ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
জুয়েল : কনসার্টের ব্যাপারে আমরা সব সময়ই খুব সিরিয়াস থাকি। বিশেষ করে স্টেজ, লাইট, সাউন্ড নিয়ে আমরা বেশ খুঁতখুঁতে। দেশেই হোক আর বিদেশেই হোক, কনসার্টের ক্ষেত্রে আমরা আমাদের ডিমান্ড ফুলফিল করার চেষ্টা করি। আর এ কারণেই আমাদের শোগুলো প্রশংসনীয় হয়। পরে শো দেখার জন্য অডিয়েন্স আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে।
মানাম আহমেদ : প্রথম শো করেছি আমরা ২২ জুন। হার্স্ট ভিলের মারানা অডিটরিয়ামে, যেখানে অডিয়েন্স ছিল প্রায় ১২০০। দ্বিতীয় শো করেছি ২৮ জুন সিডনির ব্যাংকস্টোন টাউন হলে। এখানে অডিয়েন্স ছিল প্রায় ১৫০০।
হামিন আহমেদ : এতো অডিয়েন্স হওয়ার কারণ হলো অর্গানাইজাররা তিন মাস ধরে পাবলিসিটি করেছে। সেখানকার বাংলা ক্যাবল টিভিতে প্রায় দুই মাস ধরে প্রমোশনাল অ্যাড প্রচারিত হয়েছে। ফলে সিডনির অনেক দূরবর্তী এলাকা থেকেও মাইলসের ফ্যানরা কনসার্ট দেখতে এসেছে।
শাফিন আহমেদ : সত্যি বলতে কী, কিছু কিছু ফ্যান আমাদের সারপ্রাইজ দিয়েছে। যখন আমরা জানতে পেরেছি কেউ কেউ এসেছে ১০ ঘণ্টা ড্রাইভ করে, কেউ কেউ এসেছে এয়ার ফ্লাইটে। আরো আশ্চর্যের বিষয়, অন্যান্য সিটি থেকে আমাদের কনসার্ট দেখার জন্য অনেকে অফিস থেকে ৫ দিন, ৮ দিন, ১০ দিনের ছুটি নিয়েছে।
জুয়েল : এসব অডিয়েন্সের উৎসাহ ছিল দেখার মতো। আমরা যখন গান করছিলাম তারা আমাদের সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছিল। ঢাকার মতোই শ্রোতারা নেচে-গেয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপভোগ করেছে। শো শেষে অনেককেই বলতে শোনা গেছে, গত ১০ বছরের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় নাকি এ রকম শো হয়নি। দুই শোতেই আমরা আড়াই ঘণ্টা করে পারফর্ম করেছি। দর্শক-শ্রোতাদের অনুরোধে আমাদের অনেক গানই করতে হয়েছে। উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে ছিল চাঁদ তারা সূর্য, ফিরিয়ে দাও, ধিকিধিকি, নীলা, শেষ ঠিকানা, পাহাড়ি মেয়ে, পিয়াসী মন, প্রতীক্ষা প্রভৃতি। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ান কিছু শ্রোতার অনুরোধে আমরা গানস অ্যান্ড রোজেস, বনজবি এবং ড্রিম থিয়েটারের কিছু গান করেছি।
মানাম আহমেদ : সেখানকার শ্রোতারা দেখলাম ঢাকা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ঢাকার মিউজিক সম্পর্কে তারা ভালো ধারণা রাখে। আমাদের এখানে কখন কী হচ্ছে না হচ্ছে, কে কী ধরনের গান করছে সব খবরই রাখে তারা। আমাদের খুব ভালো লাগছে, আমরা সেখানে একটা স্ট্যান্ডার্ড সেট করে দিয়ে আসতে পেরেছি। পরে সবাই এই মানের শো-ই আশা করবে। লাইট এবং সাউন্ডের ক্ষেত্রে সচেতন হবে। যে কেউ আর সেখানে যেনতেন শো করে পার পাবে না। অবশ্যই তাদের এ স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করতে হবে।
হামিন আহমেদ : বেশিরভাগ শ্রোতাই ছিল স্টুডেন্ট এবং রক মিউজিকের ফ্যান। বোঝা গেল, বাংলাদেশের রক মিউজিককে তারা বেশ মিস করে। স্টুডেন্টদের বাইরে সব ধরনের শ্রোতাই ছিল। কেউ কেউ এসেছে পুরো পরিবার নিয়ে। সঙ্গে বাচ্চা-কাচ্চা ছিল। বাচ্চারাও বেশ উপভোগ করেছে।
শাফিন আহমেদ : আমরা মোট ১২ দিন ছিলাম অস্ট্রেলিয়ায়। এই ১২ দিনে আমাদের যে প্রাপ্তি তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা বুঝতে পেরেছি, আমাদের গানগুলো এখনো কতোটা জনপ্রিয়। এখনো মাইলসের কী পরিমাণ ফ্যান রয়েছে দেশে এবং দেশের বাইরে।
জুয়েল : সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হচ্ছে, উই মেইক সাম গুড ফ্রেন্ডস দেয়ার। দেশে আসার পরও আমরা সেসব বন্ধুর কাছ থেকে প্রতিদিন কয়েকশ এসএমএস পাচ্ছি। তারা বারবার জানাচ্ছে, তারা আমাদের খুব মিস করছে। সামনের সামারে আমাদের অবশ্য আবার যেতে হবে। আমরা তাদের কথা দিয়ে এসেছি।
মানাম আহমেদ : আমাদের প্রাপ্তির খাতায় আরো একটা বড় জিনিস হচ্ছে, নরওয়ের ডেথ মেটাল ব্যান্ড চিলড্রেন অফ বডম এবং একটি পূর্ণাঙ্গ জ্যাজ ব্যান্ডের কনসার্ট উপভোগ করেছি আমরা।
হামিন আহমেদ : এছাড়া প্যাসিফিক ওশানের ডিপে গিয়ে খুব কাছ থেকে ইয়া বড় বড় তিমি মাছ দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমাদের। মাথার ওপর ছোট ছোট অসংখ্য পাখি। অসম্ভব সুন্দর। একটু খাবার দিলেই উড়ে আসে। কখনো কখনো হাত থেকে ছোঁ মেরে খাবার কেড়ে নেয়, সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য।
জুয়েল : আমার জন্য সবচেয়ে উপভোগ্য দৃশ্য ছিল, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি পূর্ব দিক থেকে সূর্য উঠছে আর ঠিক মাথার ওপর জ্বলজ্বল করছে চাঁদ। অসাধারণ দৃশ্য। একই সঙ্গে সূর্যের আলো এবং চাঁদের আলো। পৃথিবীর আর কোথাও এমন দৃশ্য দেখা যায় কি না জানি না।
শাফিন আহমেদ : এর পেছনে অন্য একটা কারণ আছে। অস্ট্রেলিয়া থেকে আকাশটাকে অনেক কাছে দেখা যায়। গ্লোবাল পজিশনের জন্য আকাশটা এতোই কাছে মনে হয়, যেন কিছুদূর উপরে উঠলেই আকাশ ধরা যাবে।
সূত্রঃ যায়যায়দিন।
Bangla Music Tags: মাইলস, মানাম আহমেদ, শাফিন আহমেদ
Post Your Comments